বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ পার্বত্য চট্টগ্রাম। আকাশছোঁয়া পাহাড়, ঘন সবুজ বনভূমি ও ঝর্ণাধারায় ঘেরা এই অঞ্চল দেশের প্রায় এক দশমাংশ ভূখণ্ড জুড়ে বিস্তৃত। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল পর্যটনের জন্য যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনি যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন থেকে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। ঘন জঙ্গল, পাহাড়ি গিরিখাত এবং বিভিন্ন নদী-ছড়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক এলাকা এখনো দুর্গম। এর সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অতীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও জটিল করে তুলেছিল। ফলে এখানকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতি বদলাতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের। বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্মিত হচ্ছে ‘সীমান্ত সড়ক’ প্রকল্প। এর লক্ষ্য হলো দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা। প্রকল্পের আওতায় তিন পার্বত্য জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ ২০২৫ সালের মধ্যভাগে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের কাজ চলছে। এই সড়ক বান্দরবানের কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করেছে, যা দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক হিসেবে বিবেচিত হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এবং তাদের অধীনস্থ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নগুলো এই সড়ক নির্মাণের কাজ তদারকি করছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, গভীর গিরিখাত, প্রতিকূল আবহাওয়া, নির্মাণ সামগ্রী পরিবহনের জটিলতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির মতো নানা বাধা সত্ত্বেও সেনাসদস্যরা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সীমান্ত সড়ক নির্মাণ শেষ হলে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগে যেখানে কোনো এলাকায় পৌঁছাতে দুই থেকে তিন দিন পাহাড়ি পথ হেঁটে যেতে হতো, এখন সেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে স্থানীয় জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হবে।
এই সড়কের মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষিজ পণ্য সহজে দেশের অন্যান্য এলাকায় পরিবহন করা যাবে। ফলে স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন। পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হবে, যা স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়াবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাও আরও সহজলভ্য হবে। দুর্গম অঞ্চলে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সহজ হবে এবং দক্ষ শিক্ষকরা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হবেন। একইভাবে স্বাস্থ্যসেবাও উন্নত হবে, কারণ রোগীদের দ্রুত উপজেলা বা জেলা শহরের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষ মূলধারার উন্নয়নের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত হবে এবং এই অঞ্চল দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন