ঢাকা, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের ঐক্য ও ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেই বিএনপি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, টানা ১৬ বছর ধরে দেশের মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই জনগণ আজ সেই অধিকার পুনরুদ্ধার করেছে, যা কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। রোববার রাতে রাজধানীর বাড্ডা সাতারকুলের সানভ্যালী মাঠে ঢাকা-১১ আসনের নির্বাচনী পথসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। পথসভায় স্থানীয় নেতাকর্মী ও বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
তারেক রহমান বলেন, অতীতে নির্বাচন হলেও জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। দেশের সর্বত্র মানুষের ভোটাধিকার কার্যত অনুপস্থিত ছিল। তবে আসন্ন নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট প্রয়োগ করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে যারা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন—তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে এসেছে। মঞ্চের পাশে উপস্থিত জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও নির্যাতিত পরিবারের সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো সকলের নৈতিক দায়িত্ব।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শুধু ভোট দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; যোগ্য ও সৎ প্রার্থী নির্বাচন করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যারা মানুষের দুর্দিনে পাশে দাঁড়ায়, উন্নয়নে কাজ করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা রাখে—জনগণকে তাদেরই বেছে নিতে হবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, গত ১৬ বছরে দেশে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও তার সঙ্গে বেড়েছে ব্যাপক দুর্নীতি। মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় আজও অনেক এলাকার মৌলিক সমস্যার সমাধান হয়নি।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি যাদের দেশ পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রস্তুত আছে।
দলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি যে কর্মসূচি জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে, সেখানে নারী, কৃষক, যুবক, শ্রমজীবীসহ সমাজের সব স্তরের মানুষের কল্যাণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, বিএনপি সরকার গঠন করলে নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে বিশেষ করে প্রান্তিক ও অসচ্ছল গৃহিণীরা সরকারি সহায়তা পাবেন। একইসঙ্গে কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ চালু করে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণে সরাসরি সহায়তা দেওয়া হবে।
তারেক রহমান বলেন, দেশের প্রায় সাড়ে চার কোটি তরুণ-যুবকের বড় একটি অংশ বর্তমানে কর্মহীন। বিএনপি ক্ষমতায় এলে কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে দেশ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
তিনি আরও বলেন, মা, বোন ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ঘরে ঘরে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্য পরামর্শ ও চিকিৎসা প্রদান করবেন।
ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিতদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে সম্মানী প্রদানের কথাও জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জনগণের জানমাল নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিএনপি সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
একই দিনে রাজধানীর ঢাকা-১২ আসনে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে আয়োজিত এক পথসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান ধানের শীষের পাশাপাশি কোদাল প্রতীকের পক্ষে ভোট চান। তিনি বলেন, ঢাকা-১২ আসনে কোদাল প্রতীকের প্রার্থী বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক অতীত আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির সহযোদ্ধা ছিলেন। তাই বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, কোদাল প্রতীকের বিজয় মানেই ধানের শীষের বিজয় এবং এই এলাকার উন্নয়নের পথ সুগম হওয়া। তিনি অভিযোগ করেন, একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি সবাইকে সতর্ক ও সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেন কোনো অপশক্তি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন পথে নিতে না পারে।
পথসভায় তিনি আরও বলেন, আগামী দিনের রাজনীতি হতে হবে দেশ গঠনের রাজনীতি এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাইকে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা-১২ আসনের পথসভা শেষে তারেক রহমান তেজগাঁওয়ে অবস্থিত বিএনপির মুখপত্র দৈনিক দিনকাল পত্রিকার কার্যালয় পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
রোববার একদিনে মোট সাতটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী পথসভায় বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৭ ছাড়াও তিনি ঢাকা-১৬, ঢাকা-১৫, ঢাকা-১৪ ও ঢাকা-১৩ আসনে দলের ও মিত্র দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চান।
এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা করতালি দিয়ে তারেক রহমানের গাড়িবহরকে স্বাগত জানান। সাতটি আসনের নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করতে তার প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিটি পথসভাতেই বিপুল মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন