প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস অতীতের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোকে ‘নাটকীয় ও ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও ঐতিহাসিক করার দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভোটের মাত্র দুই দিন আগে গতকাল সোমবার প্রায় ৭০ জন সচিবের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা সচিবদের উদ্দেশে স্পষ্ট করে বলেছেন—পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলো প্রকৃত অর্থে নির্বাচন ছিল না, বরং সেগুলো ছিল প্রহসনের নামান্তর। এবারের ভোট হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রেস সচিব জানান, ড. ইউনূস বলেন, নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি এবং দেশ ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তিনি সচিবদের আশ্বস্ত করেন, এবার ভোটাররা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। প্রধান উপদেষ্টা এবারের নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে প্রবাসীদের অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের যুক্ত হওয়া দেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিকে তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। ড. ইউনূস বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলের নির্বাচনগুলোতে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যবেক্ষকরাও অনুপস্থিত ছিলেন। তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা শান্তিপূর্ণ রয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করছে। নির্বাচনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের কথাও তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২৫ হাজার ৭০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি বসানো হয়েছে। ভোটারদের সহায়তায় ‘নির্বাচন’ ও ‘নির্বাচন বন্ধু’ নামে দুটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যা ভোটার অভিজ্ঞতা সহজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
গণভোট প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে দেশে আর অপশাসনের পুনরাবৃত্তি হবে না এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌলিক সংস্কার কার্যকর হবে।
প্রেস সচিব আরও জানান, গত ১৮ মাসে রাষ্ট্র সংস্কারে সচিবদের অবদান প্রশংসনীয়। এই সময়ে প্রায় ১৩০টি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে এসব কাজ সম্পন্ন করায় সচিবদের আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের জন্য প্রধান উপদেষ্টা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বৈঠক শেষে তিনি সচিবদের সঙ্গে গ্রুপ ছবিতেও অংশ নেন।
এদিকে, জাপানের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তিকে (ইপিএ) দেশের জন্য ‘যুগান্তকারী অর্জন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে তিনি বলেন, এই চুক্তির ফলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে এবং শিল্প ও রপ্তানিতে নতুন গতি আসবে। প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, এই ইপিএর আওতায় জাপানের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার ৪০০ পণ্য শুল্ক ছাড়াই প্রবেশের সুযোগ পাবে, যা দেশীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে।
ব্রিফিং শেষে শফিকুল আলম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এটি সম্ভবত তাঁর শেষ প্রেস ব্রিফিং। দায়িত্ব পালনের সময় কোনো আচরণে সাংবাদিকরা কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।তিনি আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় সব উপদেষ্টা ইতোমধ্যে সম্পদের হিসাব দিয়েছেন এবং সেগুলো শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৩৩০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক আসছেন, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষকই সর্বাধিক।
প্রেস সচিব বলেন, অতীতে দেশের পররাষ্ট্রনীতি একক প্রভাবের অধীনে ছিল। বর্তমানে সেটিকে মর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন ইতিবাচক। দীর্ঘ ১৮ বছর পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল পাঠানোকে তিনি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর কারণে গত দেড় বছরে দুই দেশের সম্পর্ক প্রত্যাশিতভাবে এগোয়নি। সীমান্ত হত্যা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি জানান, তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পে চীন সম্ভাব্যতা যাচাই করছে।
সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করা একটি বড় অর্জন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে বক্তব্যসংক্রান্ত সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভোটের আগে জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা ভাষণ দেবেন বলেও তিনি জানান।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন