ধানের কুড়া থেকে তৈরি হচ্ছে পুষ্টিগুণে ভরপুর ভোজ্য তেল। স্থানীয় বাজার ছাড়াও সরকারি উদ্যোগে টিসিবির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে সরবরাহ করছে উৎপাদনকারী মিল কর্তৃপক্ষ। শুধু দেশেই নয়, রপ্তানি হয়েছে বিদেশেও। একই সঙ্গে কুড়া থেকে তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্ট অংশ কাজে লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্য। ফলে ধানের কুড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত সূচনা হয়েছে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে।
উৎপাদন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধানের কুড়ার তেল অন্যান্য সাধারণ ভোজ্য তেলের চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। এতে রয়েছে ওরিজানল নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরে কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করে। প্রচুর ভিটামিন ই সমৃদ্ধ এই তেল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি এতে থাকা মনো ও পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
বর্তমানে বাজারে সয়াবিন ও অন্যান্য ভোজ্য তেল লিটারপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হলেও ধানের কুড়া থেকে উৎপাদিত এই তেল পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫০ টাকায়। ভোক্তারা প্রতি লিটারে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় পাচ্ছেন। স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই তেল তাই ভোক্তাদের জন্য যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি লাভজনকও।
সরেজমিনে গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জের পুনতাইর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে ‘প্রধান রাইচ ব্রান অয়েল মিল’। ভিতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। বিভাগভিত্তিক কর্মীরা যান্ত্রিক মেশিনের সঙ্গে সমানতালে কাজ করছেন। হাজার হাজার বস্তায় স্তুপ করা ধানের কুড়া শ্রমিকরা ঢেলে দিচ্ছেন কনভেয়ার মেশিনে। কয়েক ধাপ পেরিয়ে শেষপর্যায়ে আধুনিক রিফাইনারিতে রূপ নিচ্ছে ভোজ্য তেল।
তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্ট কুড়া যাচ্ছে অন্য সেকশনে। সেখানে তৈরি হচ্ছে মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্য। এসব খাদ্য দেশের শীর্ষস্থানীয় মৎস্য ও প্রাণিখাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর কাছে যাচ্ছে ট্রাকভর্তি হয়ে।
প্রধান রাইচ ব্রান অয়েল মিলের স্বত্বাধিকারী নাজির হোসেন প্রধান জানান, ২০১৩ সালে ভারত থেকে মেশিন এনে ২০১৬ সালে উৎপাদন শুরু করেন তিনি। শুরু থেকেই অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ বিদেশে রপ্তানি করা হতো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “তেল স্বাস্থ্যসম্মত ও দামে সাশ্রয়ী হলেও প্রচারণার অভাবে এখনো ভোক্তা পর্যায়ে আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছি না। সরকারি সহায়তায় টিসিবিতে সীমিত পরিমাণ সরবরাহ করছি। কৃষি-শিল্পভিত্তিক এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”
প্যাকেজিং সেকশনের সুপারভাইজার আব্দুল মোত্তালিব জানান, দেশের বিভিন্ন অটো ও সেমি অটো রাইচ মিল থেকে কুড়া সংগ্রহ করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন কুড়া থেকে উৎপাদিত হচ্ছে এক লাখ ১০ হাজার লিটার অপরিশোধিত তেল। আর সেখান থেকে রিফাইন করা হয় প্রায় ৪০ হাজার লিটার তেল। প্রতিলিটার তেলের দাম ১৫০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, “ধানের কুড়া থেকে শুধু তেল নয়, প্রাণিখাদ্যও উৎপাদন করা হচ্ছে। এগুলো দেশের বড় বড় কোম্পানিতে সরবরাহ করা হয়। এতে ধানের কুড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।”
স্বত্বাধিকারী নাজির হোসেন প্রধান বলেন, “এই শিল্পে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করছে। আগামী বছর সেকশন-২ চালু হলে আরও দেড় থেকে দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।”
তিনি সরকারকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “দেশের ২০টি রাইচ ব্রান অয়েল মিলকে টিকিয়ে রাখতে বিনিয়োগ ও প্রচারণায় সরকারি সহায়তা দেওয়া জরুরি। নইলে এই সম্ভাবনাময় শিল্প মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।”
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন