অ্যান্টার্কটিকার হিমশীতল পরিবেশে যখন শীতের প্রকোপ ক্রমেই বাড়তে থাকে, তখন বরফে ঢাকা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে একসঙ্গে জড়ো হয় হাজার হাজার সম্রাট পেঙ্গুইন। তীব্র ঠান্ডা ও হিমেল বাতাসের মধ্যেও সেখানে শুরু হয় তাদের বংশবিস্তারের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। এ সময় একটি স্ত্রী পেঙ্গুইন ডিম পাড়ার পর সেটি সাবধানে তার সঙ্গীর কাছে তুলে দেয়। পুরুষ পেঙ্গুইনটি ডিমটি নিজের দুই পায়ের ওপর রেখে পেটের নিচের বিশেষ চামড়ার ভাঁজ দিয়ে ঢেকে রাখে। বাইরের হিমশীতল পরিবেশ থেকে ডিমটিকে উষ্ণ রাখাই তখন তার প্রধান দায়িত্ব। অন্যদিকে, ডিম পাড়ার পর শারীরিকভাবে ক্লান্ত স্ত্রী পেঙ্গুইনকে খাবার সংগ্রহের জন্য সমুদ্রে যেতে হয়। দীর্ঘদিন ডিম তৈরির কারণে শরীরে জমে থাকা শক্তি ফিরে পেতে মাছ ও ছোট সামুদ্রিক প্রাণী খুঁজে খাওয়াই তার লক্ষ্য।
সঙ্গীকে ডিমের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে সে অন্য পেঙ্গুইনদের সঙ্গে সমুদ্রের পথে যাত্রা করে। আর পুরুষ পেঙ্গুইনটি থেকে যায় বরফের ওপর, অনাগত সন্তানের অপেক্ষায়। দিন যত গড়ায়, ডিম রক্ষা করার দায়িত্ব তত কঠিন হয়ে ওঠে। সামান্য অসতর্কতায় ডিমটি পায়ের ওপর থেকে পড়ে গেলে প্রচণ্ড ঠান্ডায় সেটি জমে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই চলাফেরার সময়ও পুরুষ পেঙ্গুইনকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। এদিকে তাপমাত্রা আরও কমতে থাকে। হিমেল বাতাস ও উড়ে আসা বরফের মধ্যেও নিজের শরীরের উষ্ণতা দিয়ে ডিমটিকে নিরাপদ রাখে সে। এ সময় খাবার সংগ্রহের জন্য সমুদ্রে যাওয়ার সুযোগও থাকে না। শরীরে সঞ্চিত শক্তির ওপর নির্ভর করেই তাকে দীর্ঘ সময় পার করতে হয়।
কলোনিতে থাকা অন্য পুরুষ পেঙ্গুইনরাও একইভাবে ডিম পাহারা দেয়। প্রচণ্ড ঠান্ডা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তারা দলবদ্ধভাবে একে অপরের কাছাকাছি দাঁড়ায়। পালাক্রমে অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে ঠান্ডা বাতাসের চাপ সামলে শরীরের তাপ ধরে রাখার চেষ্টা করে। এভাবে প্রায় দুই মাস কেটে যাওয়ার পর একসময় ডিমের খোলসে ফাটল দেখা দেয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে খোলস ভেঙে পৃথিবীর আলোয় আসে নতুন একটি পেঙ্গুইন ছানা। ছানাটির শরীরে তখন নরম ধূসর পালক। বাইরের ঠান্ডা পরিবেশে টিকে থাকার মতো শক্তি তার নেই। তাই জন্মের পরপরই বাবার শরীরের উষ্ণ আশ্রয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখে সে। এতদিন ডিম আগলে রাখার পর এবার ছানাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে পুরুষ পেঙ্গুইনের শরীরে তখন শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। অন্যদিকে মা পেঙ্গুইনেরও সমুদ্র থেকে ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে আসে।
কয়েক দিন পর খাবার সংগ্রহ শেষে স্ত্রী পেঙ্গুইনটি কলোনিতে ফিরে আসে। হাজার হাজার পেঙ্গুইনের ভিড়ে পরিচিত ডাকের মাধ্যমে সে নিজের সঙ্গীকে খুঁজে নেয়। এরপর ছানাটিকে নিজের পায়ের ওপর তুলে নিয়ে তার যত্নের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এবার খাবারের সন্ধানে সমুদ্রে যাওয়ার পালা পুরুষ পেঙ্গুইনের। দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার পর শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি ফিরে পেতে তাকে খাবার সংগ্রহ করতে হয়। কারণ, ছানার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য মা-বাবা দুজনেরই সুস্থ থাকা প্রয়োজন। প্রতিকূল পরিবেশ, বরফের বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর তীব্র শীতের মধ্যেও সম্রাট পেঙ্গুইনদের জীবন এভাবেই এগিয়ে চলে। বাসা তৈরির সুযোগ না থাকলেও নিজেদের শরীরের উষ্ণতা দিয়ে তারা ডিম রক্ষা করে এবং পরম যত্নে নতুন ছানাকে বড় করে তোলে।
অ্যান্টার্কটিকার এই কঠিন পরিবেশে একটি ছোট্ট পেঙ্গুইনের পৃথিবীতে আসার পেছনে থাকে তার মা-বাবার দীর্ঘ অপেক্ষা, ত্যাগ ও নিরলস পরিচর্যা। প্রকৃতির বুকে এটি নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ পারিবারিক দায়িত্ববোধের উদাহরণ।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন