মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিয়মিতভাবে তাদের ওয়েবসাইটে ইরানে পরিচালিত সামরিক অভিযানের কিছু তথ্য প্রকাশ করছে। এতে হামলার সংখ্যা, ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং লক্ষ্যবস্তুর সাধারণ শ্রেণিবিন্যাস—যেমন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র—উল্লেখ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক। তবে প্রকাশিত তথ্যের বাইরেও বড় একটি অংশ অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। কোন নির্দিষ্ট স্থানে হামলা হয়েছে, কী ধরনের গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে, কিংবা হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন (Battle Damage Assessment) সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু গোপনীয়তার বিষয় নয়; বরং আধুনিক আকাশ অভিযানের সীমাবদ্ধতাকেও ইঙ্গিত করে।
স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ও এয়ার ওয়্যারফেয়ার বিশেষজ্ঞ ড. কেলি গ্রিকো ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজকে বলেন, লক্ষ্যবস্তুর এই তালিকা দেখেই বোঝা যায় আকাশ হামলা একা কতটা সীমিত ফল দিতে পারে। তার মতে, এ কারণেই “স্থল সেনা মোতায়েন” বা গ্রাউন্ড ফোর্স ব্যবহারের আলোচনা আবার সামনে আসছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। দুটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটসহ প্রায় ৫ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে, পাশাপাশি দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনীর অংশ হিসেবে আরও প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রুপার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই অভিযানে মার্কিন সেনা উপস্থিতি প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের উদ্বেগ স্থল অভিযানের সম্ভাব্য পরিণতি ঘিরেই বেশি। ওয়াশিংটনভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক উইলিয়াম হার্টুং সতর্ক করে বলেন, ইরানে স্থল অভিযান শুরু হলে তা ইরাক যুদ্ধের চেয়েও বেশি জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। ড. গ্রিকোর মতে, গত দুই দশকের ইরাক ও আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মার্কিন জনমতকে নতুন আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষণে সম্ভাব্য দুটি প্রধান লক্ষ্যও উঠে এসেছে। প্রথমটি হলো ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ। কিন্তু এটি দখল করলেও ইরান উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিকল্প কৌশলে পাল্টা আঘাত হানতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্বিতীয় লক্ষ্য হিসেবে পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে। যদিও আকাশ হামলায় কিছুটা ক্ষতি করা সম্ভব, তবে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা বা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের শক্তির মূল ভিত্তি তাদের “অসম যুদ্ধ কৌশল” বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার। এই কৌশলে তারা প্রতিপক্ষকে সরাসরি না হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। ফলে প্রতিটি আঘাতের জন্য আক্রমণকারী পক্ষকে বেশি সম্পদ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন মোকাবিলায় লাখো ডলারের ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহারের ফলে ব্যয় দ্রুত বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন হার্টুং।
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে গবেষকেরা “হাইব্রিড এয়ার ডিনায়াল” নামে একটি ধারণাও তুলে ধরেছেন, যেখানে আকাশ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে প্রতিপক্ষের জন্য আকাশপথ ব্যবহারে খরচ ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সবশেষে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন একটাই—এই সংঘাত কোথায় গিয়ে থামবে? ড. গ্রিকোর মতে, দুর্বল ইরান মানেই স্থিতিশীল ইরান নয়; বরং আরও কঠোর ও প্রতিক্রিয়াশীল শাসনব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, হারেৎজ, স্টিমসন সেন্টার, কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন