দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট, বাল্যবিয়ের প্রবণতা এবং মাঠপর্যায়ে কর্মীস্বল্পতার কারণে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও জন্মহার আবার বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে জন্মহার কমিয়ে ২-এর কাছাকাছি নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল, তা উল্টো বেড়ে এখন ২ দশমিক ৪-এ পৌঁছেছে, যা দেশের জন্য উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত এক থেকে দেড় বছর ধরে সরকারি সরবরাহে ঘাটতির কারণে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের জন্মনিরোধক সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক দম্পতি পরিকল্পিতভাবে পরিবার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা বাড়ছে।
সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির আওতায় সাধারণত পাঁচ ধরনের জন্মনিরোধক সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি হিসেবে আইইউডি, ইনজেকশন এবং ইমপ্ল্যান্ট বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। কিন্তু এসব সামগ্রীর ঘাটতি বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের পরিচালক ডা. নাছির আহমদ বলেন, গত দেড় বছর ধরে প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় জন্মহার বাড়ার পেছনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন জন্মহার স্থিতিশীল থাকলেও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তার প্রভাব দ্রুত দেখা দেয়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত মালটিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস)–এর ফলাফলেও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মোট প্রজনন হার ছিল ২ দশমিক ৩, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪-এ। একই সঙ্গে জন্মনিরোধক ব্যবহারের হারও কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপে দেখা যায়, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি বিবাহিত নারীদের মধ্যে জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার ২০১৯ সালে ছিল ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। আধুনিক জন্মনিরোধক পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক বলেন, জন্মহার বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য ও সামাজিক পরিস্থিতি অনেক সময় জন্মহারে প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৬ কোটি সক্ষম দম্পতির গড়ে দুইটি সন্তান হওয়ার কথা থাকলেও যদি গড় সন্তান সংখ্যা ২.৪ হয়ে যায়, তাহলে তা জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি করবে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫৩ লাখ নারী গর্ভধারণ করেন। এর মধ্যে ৩৩ থেকে ৩৪ লাখ নারী সন্তান জন্ম দেন, আর প্রায় ১৯ লাখ ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটে।
এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের উপপরিচালক ডা. আ ন ম মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, জন্মহার দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকলেও সরবরাহ সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তা কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি দেশের একটি বড় অংশ বিদেশে কাজ করেন এবং তারা দেশে আসা-যাওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিত পরিবার গঠনের সুযোগ পান না, ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানের জন্মের ঘটনাও ঘটে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন