ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন ধরে প্রচারবিমুখ ও স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত হলেও ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে তার গভীর সংযোগ রয়েছে। বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বাবার শাসনামলে মোজতবা খামেনি কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পদে ছিলেন না। তবে ধারণা করা হয়, নেপথ্যে থেকে তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতেন। বিশেষ করে ইরানের শক্তিশালী ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সমর্থন লাভ করেন। সরকারি অনুষ্ঠান বা গণমাধ্যমে খুব একটা দেখা না যাওয়ায় এতদিন মোজতবা খামেনির প্রকৃত প্রভাব নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা আলোচনা ছিল। সোমবার মধ্যরাতের কিছু পরে ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ এক বিবৃতিতে তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটলেও এবার কার্যত বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের ধারাই অব্যাহত থাকল। যদিও ২০২৪ সালে আলি খামেনি নীতিগতভাবে এমন উত্তরাধিকার ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন। মোজতবা খামেনি ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আলি খামেনি নিহত হন। ওই হামলার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
ধর্মীয় পোশাকে পরিচিত মোজতবা খামেনি একজন ইসলামি পণ্ডিত। মহানবী (সা.)-এর বংশধর হওয়ায় তিনি কালো পাগড়ি বা ‘সৈয়দ’ উপাধি ধারণ করেন। ১৯৮০–এর দশকে ইরান–ইরাক যুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, সরকারি কোনো পদে না থেকেও তিনি বাবার হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করতেন এবং আঞ্চলিক কৌশল ও অভ্যন্তরীণ দমনমূলক নীতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন।
বিরোধীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর যে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ হয়েছিল, তা দমনে মোজতবা খামেনির ভূমিকা ছিল। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ডলারের বেশি। বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে তেল বিক্রির অর্থ তিনি ব্রিটেনের আবাসন খাত, ইউরোপের হোটেল ব্যবসা এবং দুবাইয়ের স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাজীবনে তিনি কোম শহরের ধর্মীয় সেমিনারিতে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেখানে শিক্ষকতাও করেন। এতদিন তার ধর্মীয় পদবি ছিল ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তাকে ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধি দেওয়া হয়েছে। ইরানের ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ প্রতি আট বছর অন্তর নির্বাচিত হয় এবং সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব তাদের ওপর ন্যস্ত। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আলি খামেনিকে এবং এবার মোজতবা খামেনিকে নির্বাচন করে এই পরিষদ নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করল।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন