ঢাকা | |

নারী ক্ষমতায়নে দিকপাল এখন কৃষাণী সুলেখা

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ঝিকরার বাসিন্দা সুলেখা খাতুন। একসময় দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ আর সামাজিক বাধার মধ্যে জীবন
  • আপলোড সময় : ৮ মার্চ ২০২৬, দুপুর ২:২০ সময়
  • আপডেট সময় : ৮ মার্চ ২০২৬, দুপুর ২:২০ সময়
নারী ক্ষমতায়নে দিকপাল এখন কৃষাণী সুলেখা

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ঝিকরার বাসিন্দা সুলেখা খাতুন। একসময় দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ আর সামাজিক বাধার মধ্যে জীবন কাটালেও আজ তিনি একজন সফল নারী কৃষক এবং এলাকার বহু নারীর অনুপ্রেরণার উৎস। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর বিয়ের মাধ্যমে নতুন জীবনে পা রাখেন সুলেখা। স্বামীর অনিয়মিত আয় এবং পারিবারিক আর্থিক সংকট তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে তোলে। পরিবারে আট ভাই-বোনের সংসার থেকে আসা এই তরুণী বিয়ের পরও সংগ্রামের মধ্যে পড়েন। তিনি স্মরণ করে বলেন, বিয়ের সময় তিনি পড়াশোনা করছিলেন, কিন্তু স্বামীর স্থায়ী আয় না থাকায় সংসারে অনিশ্চয়তা ছিল এবং অনেকেই তাকে পরিবারের জন্য বোঝা মনে করত।


কঠিন সময়ের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান সুলেখা। পাশাপাশি বাড়ির পেছনের ছোট্ট এক টুকরো জমিতে চাষাবাদ শুরু করেন। শুরুটা সহজ ছিল না। কৃষি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আর্থিক সামর্থ্যের অভাব ছিল তার পথে বড় বাধা। তবে তিনি থেমে থাকেননি। এসএসসি পাসের পর স্থানীয় একটি এনজিওতে স্বল্প বেতনে চাকরি নেন তিনি। স্বামী তখন বেকার, ফলে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। এরই মধ্যে প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই মারা যায়, যা তার জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। তবুও তিনি হার মানেননি। চাকরির সামান্য আয় থেকে টাকা জমিয়ে একটি গাভী কেনেন এবং এক বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেন। সমাজের নানা কটূক্তি সত্ত্বেও মাঠে নেমে চাষাবাদ চালিয়ে যান।


২০২৩ সালে তিনি “ফার্মার স্কুল” নামে একটি কৃষি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথা জানতে পারেন। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ ইউনিয়নে স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় সিনজেনটা বাংলাদেশ এই উদ্যোগ গড়ে তোলে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সার ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় দমন, মাটির স্বাস্থ্য, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারসহ নানা বিষয়ে এখানে কৃষকদের বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সুলেখা এই ফার্মার স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষিকাজে নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন। পাশাপাশি কৃষি ঋণ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও পান। এর ফলও আসে দ্রুত।


বাড়ির পেছনের ছোট্ট জমি থেকে শুরু হওয়া তার কৃষিকাজ এখন প্রায় ১৬ বিঘা জমিতে বিস্তৃত হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে সাতটি আমবাগান এবং একটি ছোট গরুর খামার। আজ তিনি একজন স্বাবলম্বী কৃষক হিসেবে পরিচিত। সুলেখার এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জাতীয় পর্যায়ে ‘জয়িতা’ পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি এলাকার অন্যান্য নারী কৃষকদের পরামর্শ দেন এবং একজন কমিউনিটি লিডার হিসেবে কাজ করছেন।


চারঘাট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সুলেখা দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা জয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার সাফল্য অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা। সিনজেনটা ফার্মার স্কুল ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার ক্ষুদ্র কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নারী। এতে গ্রামীণ কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।


সুলেখা বলেন, আধুনিক কৃষি পদ্ধতি শেখার ফলে তার উৎপাদন বেড়েছে, খরচ কমেছে এবং আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। তিনি চান গ্রামের আরও নারীরা কৃষিতে এগিয়ে আসুক এবং নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলুক।


একসময় যিনি ছিলেন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এক সাধারণ গৃহবধূ, আজ সেই সুলেখাই হয়ে উঠেছেন একজন সফল কৃষক ও বহু নারীর প্রেরণার আলো।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
১ মাস পর অনুশীলনে ফিরলেন নেইমার, মাঠে নামবেন কবে

১ মাস পর অনুশীলনে ফিরলেন নেইমার, মাঠে নামবেন কবে