তারেক রহমানকে পছন্দ করেন না-এমন একজন ব্যক্তিও নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে স্বৈরশাসনের সময় বক্তব্য প্রদানের নিষেধাজ্ঞা পাওয়া মানুষটির চরিত্রহননে এমন কোনো কিছু নেই, যা করা হয়নি। ফলে তার সম্পর্কে একটা মিশ্র ধারণা তরুণ প্রজন্মের মাঝে জন্মাতেই পারে, কিন্তু তারেক রহমানকে অপছন্দ করেন, এমন মানুষও নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী তাকে যারা দেখেছেন, শুনেছেন, তারা তাদের আগের ভ্রান্ত ধারণার সঙ্গে আর থাকতে পারছেন না।
এটা অনস্বীকার্য যে এতদিনে তারেক রহমান নিজেকে একজন ভিন্ন ধাঁচের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন সফলভাবে। তিনি কথা বলেন শান্তভাবে প্রথাগত উচ্চকণ্ঠে নয়, প্রতিপক্ষের ব্যাপারে তার পরিমিতিবোধ প্রশংসনীয়, কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণে জড়ান না নিজেকে।
অন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এমনকি পতিত স্বৈরশাসনের প্রধান ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তার উচ্চারণ থাকে পরোক্ষ। তার এই সহনশীলতা যে লোকদেখানো নয়, সেটা প্রতিভাত হয় যখন তাকে নিয়ে আঁকা বিদ্রুপাত্মক কার্টুনকে তিনি নিতে পারেন ঔদার্যে, এক পা বাড়িয়ে বলেন ভবিষ্যতেও এই কার্টুন আঁকার ধারা যেন বজায় থাকে।
এ কথাগুলো এজন্যই বলা যে জনগণ সম্ভবত তার মাঝে একটা নৈকট্য খুঁজে পেতে শুরু করেছে। মনে করছে মানুষটা আমাদেরই একজন।
তার কথাগুলো মানুষ আর আজ আর নিছক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বলে মনে করছে না, তিনি তার রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা যখন বলেন, তখন তার আন্তরিক উচ্চারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এগুলো তার সযত্নে লালিত স্বপ্ন, আর এসব বলার সময় তার অভিব্যক্তি আর চোখের ভাষায় এতটুকু অন্তত বোঝা যায় যে এগুলো তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এগুলো বাস্তবায়িত কতটা হবে সেই প্রশ্ন সমালোচকদের থাকতেই পারে, কিন্তু তার ভাবনাটা যে শুদ্ধ আর অন্তরের, সেটা নিয়ে সন্দেহ করাটা হবে ভীষণ অমানবিক। তিনি প্রায়ই আগামী দিনে সরকারে তার কর্মপরিকল্পনার কথা বলেন। সম্প্রতি কথাগুলো তিনি ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছেন তার দলের কর্মীদের মাধ্যমে, আর তার সেই বার্তাবাহকদের মধ্যে যাদের তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, তারা হলো নবপ্রজন্মের বাহক-ছাত্রসংগঠন থেকে শুরু করে যুবদল, মহিলা দল আর মূল দল অবধি।
এই মতবিনিময় অনুষ্ঠানের নাম ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানে তিনি তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রশিক্ষিত করেছেন, তার বিবেচনায় আটটি অতিগুরুত্বপূর্ণ জনচাহিদার বিষয়ের ওপর। তার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য সমাজে নারীর মর্যাদা ও সম্মান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা। তিনি কৃষক কার্ডের কথা বলেছেন, যেখানে প্রান্তিক কৃষকের জন্য ভর্তুকিমূল্যে ফসলের জন্য বীজ, সার, কীটনাশক দেওয়ার কথা আছে, আছে কৃষিপণ্যের মূল্য নিশ্চয়তার কথা। নামমাত্র সার্ভিস চার্জে কৃষিঋণ প্রাপ্তির সুবিধা, মৎস্যজীবী পোলট্রিচাষিদেরও তিনি এর আওতায় রাখতে চেয়েছেন।
তার অন্য পরিকল্পনাগুলো হলো-স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, কর্মসংস্থান নিয়ে। কর্মসূচিতে আছে পরিবেশ, ইমাম-মুয়াজ্জিন-খতিবদের এবং সব ধর্মের উপাসনাপ্রধানদের সম্মাননা প্রদানের বিষয়ও এই অগ্রাধিকারে। স্বল্পপরিসরে সবগুলো নিয়ে কথা বলা হয়তো সহজ নয়, কারণ সেটায় তথ্যবিভ্রান্তির সুযোগ থাকে। আজ এখানে শুধু ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা করা যেতে পারে। আর আলোচনাটি নির্মোহ হওয়াই ঠিক হবে। এটা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, কতটা নিছক স্বপ্নবিলাস, অর্থায়ন কীভাবে হবে, দুর্নীতিমুক্ত থাকবে কি না, সত্যিকার নিম্নবিত্তরা পাবে নাকি তেল মাথায় তেল ঢালা হবে, সেটাও দেখা দরকার। প্রমাণ করতে হবে কতটা আন্তরিক তিনি? নাকি নির্বাচনের আগে প্রথাগত প্রতিশ্রুতির তালিকার নব সংযোজন? দেখা যাক বিশ্লেষণ কী বলে।
ঠিক এ মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ হতদরিদ্র, যার মধ্যে প্রায় এক কোটি মানুষের সঠিকভাবে খাবার জোটে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যবৃদ্ধির শিকার প্রায় ৮৮ শতাংশ মানুষ, যাদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির। প্রতি ১০০ জন শিশুর ৩০ জনই পুষ্টিহীনতার শিকার। সঞ্চয়হীন, অপুষ্টির শিকার এই পরিবারগুলো বাধ্য হয়েই বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমের ওপর নির্ভরশীল। প্রশ্ন হলো-এত দিন ধরে সরকার এসবের প্রতিকারে কি করছে? কাগজকলমে ২৩ মন্ত্রণালয় আর বিভাগ প্রায় ১৪০টি কল্যাণমুখী প্রকল্প পরিচালনা করছে। সামগ্রিকভাবে বছরে ব্যয় হচ্ছে ৯ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। ফলাফল! পরিসংখ্যানে বেরিয়ে এসেছে হতাশাচিত্র। সুবিধাভোগীদের ৬২ শতাংশই গরিবও নয় এবং কোনো ঝুঁকিতেও নেই। এক একটি কর্মসূচির জন্য পৃথক গুদাম, পরিবহন, বিতরণ আর পরিচালন ব্যয়, সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগ তো আছেই। টিসিবি যেসব নৃত্যপণ্য সরবরাহ করে, সেটা বিনামূল্যে তো নয়ই আর মাসের চাহিদা পূরণের জন্যও যথেষ্ট নয়।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমানের প্রস্তাবনা ‘ফ্যামিলি কার্ড’। প্রশ্ন হলো, এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চলমান অন্যান্য কল্যাণ কর্মসূচি থেকে আলাদা কীভাবে? বলা হয়েছে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কার্ডের প্রাপক হবেন পরিবারের নারীপ্রধান বা গৃহকর্ত্রী। প্রশ্ন হলো, নারী কেন? উদ্দেশ্য নারীকে সম্মানিত করা। আর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, নারীরা সাধারণত মিতব্যয়ী হন, তারা প্রাপ্য সুবিধার সঠিক ব্যবহার করেন, সঞ্চয়ী হন, সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে চান, ফলে ফ্যামিলি কার্ড যদি তাকে আর্থিক সুবিধা দেয় তাহলে এর যথাযথ ব্যবহারে নারীরাই সঠিক নির্বাচন। যুক্তি হিসাবে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
আরও আগ বাড়িয়ে হয়তো এটাও বলা যায়, এই কার্ড নারীকে নিরাপত্তা দেবে, ফলে কথায় কথায় তাকে বিবাহবিচ্ছেদ বা গৃহত্যাগের শিকার হতে হবে না। পরের প্রশ্ন হলো, ফলভোগীদের নির্বাচন কীভাবে করা হবে? তারেক রহমানের পরিকল্পনা বলছে, কার্ড প্রাপক নির্বাচনপ্রক্রিয়া হবে একটা পরিবারের উপার্জন, বাসস্থান, শিক্ষা, টয়লেটের ধরন, পানির সুবিধা কতটা পায়, এসবের প্রাথমিক তথ্য ভিত্তিতে। আরও স্বচ্ছ করতে দ্বিতীয় ধাপে স্থানীয় শিক্ষক, ইমাম, সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গ্রামীণ সভায় সবার সামনে পরিবারগুলো নির্বাচিত হবে। তৃতীয় ধাপে মোবাইল অ্যাপে আবেদন করতে হবে, যাতে এই সহায়তার টাকা বা পণ্য পেতে কারও অনুগ্রহের ওপর অপেক্ষা করতে না হয়। এখন দেখা যাক ফ্যামিলি কার্ডে সুবিধা কী থাকবে। পরিকল্পনা রয়েছে প্রতি পরিবারকে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা ২৫ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, এক কেজি মসুর ডাল, দুই লিটার ভোজ্য তেল আর এক কেজি লবণ দেওয়া হবে প্রতি মাসে।
তারা হিসাব করে দেখেছেন পাঁচ সদস্যের একটা পরিবারের জন্য এই পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ও সুবিধার পরিমাণ বাড়বে এমন আশাবাদও আছে। আপাতদৃষ্টিতে পরিকল্পনাটি কল্যাণমুখী সন্দেহ নেই। তবে এর বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ কম নেই। বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার অর্থের জোগান, সঠিক পরিবার নির্বাচন, বিতরণ, সরবরাহ নিশ্চিত করা। তবে আশার কথা হলো, এই প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে গরিব-ধনী-নির্বিশেষে দেশের সব পরিবারই এর আওতায় আসবে। সুতরাং এতে দুর্নীতির সুযোগ কমবে, আর প্রকল্প সফল হলে বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যও স্থিতিশীল হবে। বাজারের অস্থিরতা কমবে, পুষ্টি সমস্যার উন্নতি হবে। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমবে। শেষ কথা হলো, তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ডের এই প্রকল্প আটঘাট বেঁধেই নিয়েছেন মনে হয়। এটা নিছক নির্বাচনি চমক হলে এর ভালোমন্দ আর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এত বিস্তারিত বলার প্রয়োজন তার হতো না। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম দেশের প্রান্তিক জনগণের কল্যাণে ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটা যুগান্তকারী প্রকল্প যেন সফল হয়, এর সুবিধা যেন সেই সুবিধাবঞ্চিতদের কাছে পৌঁছায়। তারেক রহমান আপনার সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, এটা প্রমাণ করা যে ফ্যামিলি কার্ড যেন নিছক কথার কথা নয়। আমরাও আপনার মতো আশাবাদী হতে চাই। দেখার অপেক্ষায় রইলাম, প্রতিশ্রুতি পূরণে জিয়া পরিবারের ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি যেন আপনার মাধ্যমেই হয়।
লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ, বগুড়া
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন