বেইজিংয়ের উত্তর উপকণ্ঠে টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩০ জনের। মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রবল বর্ষণ, ধ্বংসাত্মক বন্যা ও ভূমিধসে আবারও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশটি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চীনের উত্তরাঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই জনবহুল অঞ্চলটি শুধু বিশাল শহর-নগর নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক এলাকাও। এখানকার বাসিন্দারা দিন দিন আরও বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে , গ্রীষ্মকালীন ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, দাবদাহ ও খরার কবলে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
রাজধানী বেইজিংয়ের মিয়ুন জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে সোমবার (২৯ জুলাই) বৃষ্টির তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। সেখানে ২৮ জন এবং কাছাকাছি ইয়ানছিং জেলায় আরও ২ জন প্রাণ হারান বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা সিসিটিভি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কাদামাখা বন্যার পানি মিয়ুনের আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করে, গাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে ফেলে এবং রাস্তাঘাট নদীতে পরিণত করে।
এ পর্যন্ত ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মিয়ুন থেকে সরানো হয়েছে অন্তত ১৭ হাজার বাসিন্দা। শতাধিক গ্রামে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, এবং বহু রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।
একজন নারী, যিনি মিয়ুনের এক ছোট শহরে থাকেন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম শাওহংসু-তে লিখেছেন, “সারা রাত আমি এক ধরনের ভয়ানক আতঙ্কে ছিলাম। আমার বেড়ে ওঠার জায়গাটা এক রাতেই ধ্বংস হয়ে গেছে। কল্পনাও করিনি যে রাজধানী বেইজিংয়েও এমন ভয়াবহ ধ্বংস দেখা যাবে।”
মঙ্গলবার সকাল থেকে দমকলকর্মীরা উদ্ধারকাজ শুরু করে। ফোন-নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তা পুনরুদ্ধারে কাজ করছে টেলিযোগাযোগ টিম। স্থানীয়রাও এগিয়ে এসেছেন উদ্ধারকাজে। একজন ব্যক্তি নিজ বোট দিয়ে ১৭ জনকে এবং আরেকজন এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করে ৮০ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন বলে জানিয়েছে সিসিটিভি।
সোমবার মিয়ুনে একটি বাঁধে পানি ধারণের সর্বোচ্চ মাত্রা ৬,৫৫০ ঘনমিটার পৌঁছালে তা থেকে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে নতুন প্রবল বৃষ্টিপাতের জন্য জায়গা তৈরি হয়।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার বরাতে জানা যায়, সাম্প্রতিক এই বৃষ্টিতে বেইজিংয়ে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬৬ মিলিমিটার, যা পুরো জুলাই মাসের গড় বর্ষণ পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে মিয়ুনে—৫৪৩ মিলিমিটার, যা বেইজিংয়ের বাৎসরিক গড় বৃষ্টির প্রায় সমান।
সোমবার বেইজিং কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ মাত্রার বন্যা সতর্কতা জারি করে। সাধারণ মানুষকে উঁচু পানি ও নদীর কাছাকাছি না যেতে বলা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় স্কুল, নির্মাণ প্রকল্প ও পর্যটন স্পটগুলো। গ্রামীণ এলাকায় হোমস্টে ও ক্যাম্পিং কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ রাজধানীর কেন্দ্রে বৃষ্টি থেমে আসে এবং শহরতলিতে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই দুর্যোগে “গুরুতর প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি” হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি উদ্ধারকর্মীদের নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে এবং ঝুঁকিপূর্ণদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “চীনে, বিশেষ করে বেইজিংয়ে প্রবল বৃষ্টিপাতে প্রাণহানির খবরে আমরা গভীরভাবে দুঃখিত। যাঁরা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা।”
উল্লেখ্য, এর আগেও বেইজিংয়ে ২০২৩ সালে ১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বৃষ্টি হয়েছিল, আর ২০২১ সালে রেকর্ড বৃষ্টিপাতে প্রাণ হারান ৩৩ জন।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন