ফ্রান্স, এরপর যুক্তরাজ্য, আর এখন কানাডা—বিশ্বের তিন প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর আগে ১৪০টিরও বেশি দেশ এ সমর্থন জানালেও, এই নতুন পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিরা তাদের আন্দোলনে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল এই ঘোষণাগুলোকে “সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করা” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের প্রতি ক্ষোভ, নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ চাপ, এবং ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের করুণ চিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষোভ। যদিও প্রতীকী হলেও, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও কানাডার এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমেই একঘরে করে দিচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ক্রমেই বিরক্ত হচ্ছেন, বিশেষত গাজায় দুর্ভিক্ষের অভিযোগ নিয়ে—যা নেতানিয়াহু অস্বীকার করলেও ট্রাম্পের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প আঞ্চলিক শান্তি চান এবং চান নোবেল শান্তি পুরস্কারের স্বীকৃতি। তার লক্ষ্য সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি করানো, যা তার প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণ হবে। তবে রিয়াদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অপরিবর্তনীয় পথ না থাকলে এ চুক্তি সম্ভব নয়।
হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহতের পর শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত গাজায় ৬০,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এখনো বহু ইসরায়েলি জিম্মি গাজায় আটক রয়েছে।
অনেকে মনে করছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনই হতে পারে এই যুদ্ধের অবসান এবং জিম্মি মুক্তির পথ। কিন্তু সমস্যাটি হলো—আধুনিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনো বাস্তবে ছিল না, তাই এর রূপরেখা আঁকাই চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা পায় এবং দ্রুত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের কাছে সেই সময়টি “আল-নাকবা” বা বিপর্যয়—যখন লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর ও গাজা দখল করে, ফলে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড ক্রমশ ছোট ও বিভক্ত হয়ে যায়।
১৯৯০-এর দশকের অসলো চুক্তি ছিল ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছাকাছি বাস্তবায়িত পরিকল্পনা, যা ১৯৬৭ সালের সীমারেখা ভিত্তিক ছিল। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইয়িতজাক রবিনের ১৯৯৫ সালের হত্যাকাণ্ডের পর সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যা একটি সংযুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা ক্ষীণ করছে।
পশ্চিম তীরের আংশিক নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করেন অনেক ফিলিস্তিনি।
নেতানিয়াহু সরাসরি বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে “ইসরায়েল ধ্বংসের উৎক্ষেপণস্থল”। তার জোটের আরও কঠোরপন্থী মন্ত্রীরা শুধু রাষ্ট্র বিরোধীই নন, বরং গাজায় খাদ্য সহায়তা বন্ধের হুমকি দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি সরকারের অংশীদার না থাকলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কার্যকর হবে না, বরং নেতানিয়াহুকে আরও শক্ত অবস্থানে দাঁড় করাতে পারে।
তবুও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের দাবি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, ইসরায়েল যদি নিজের অবস্থান না বদলায়, তবে প্রতিবাদের মুখে তাদের কূটনৈতিক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন