যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কেয়ার স্টারমার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যা ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্টারমার জানিয়েছেন, “গাজায় ভয়াবহ পরিস্থিতির অবসানে, যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে এবং টেকসই শান্তির জন্য আন্তরিক পদক্ষেপ নিলে” ইসরায়েলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে স্বীকৃতি স্থগিত রাখা যেত। তবে ইসরায়েল এই প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ব্রিটেন আশা করছে, তাদের এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয় পক্ষের মধ্যপন্থী শক্তিকে উৎসাহিত করবে এবং শান্তির সম্ভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করবে।
স্টারমার স্বীকার করেন, এই স্বীকৃতি দিয়েই ফিলিস্তিনে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের বাস্তবতা দ্রুত আসবে না। তবে এটিই তাদের কূটনৈতিক অবস্থান, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি ‘ডিপ্লোম্যাটিক ক্রোবার’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্টারমারের বক্তব্যের পরপরই ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে রাতে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বিবৃতিতে বলেন, “স্টারমার হামাসের ভয়াবহ সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত করছেন এবং ভুক্তভোগীদের শাস্তি দিচ্ছেন। আজ ইসরায়েলের সীমান্তে একটি জিহাদী রাষ্ট্র স্থাপন হলে কাল তা ব্রিটেনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।”
নেতানিয়াহু দাবি করেন, গাজায় দুর্ভিক্ষ ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ইসরায়েল দায়ী নয়। যদিও তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা বহুদিন ধরেই করে আসছেন এবং এ মাসের শুরুতেও বলেছেন— “ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে ৭ অক্টোবরের মতো হামলার নতুন লঞ্চপ্যাড।”
নেতানিয়াহু এখন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সমর্থনের আশায় আছেন। মার্কিন সরকারের অবস্থান হলো, এখনই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হামাসের সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত করা।
প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্কটল্যান্ড থেকে ফিরতে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ব্রিটেনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন না।
জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত দুই-রাষ্ট্র সমাধান বিষয়ক সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ফিলিস্তিন স্বীকৃতির ঘোষণা দেন এবং সেই মুহূর্তে কক্ষজুড়ে করতালিতে ভরে ওঠে।
তিনি বলেন,“ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির মাঝে কোনো বিরোধ নেই, বরং পরস্পর পরিপূরক।”
তিনি আরও বলেন, “নেতানিয়াহু সরকারের দুই-রাষ্ট্র সমাধান প্রত্যাখ্যান নৈতিক ও কৌশলগতভাবে ভুল।”
ল্যামি তাঁর ভাষণে ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক অতীতের প্রসঙ্গও তুলে আনেন। তিনি বলেন, ব্রিটেন ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি—এটি একটি ‘ঐতিহাসিক অবিচার’ যা এখনও চলছে।
তিনি ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা স্মরণ করেন, যেখানে ব্রিটেন “ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে একটি জাতীয় আবাস” গঠনের সমর্থন জানালেও স্পষ্টভাবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—যা বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
দীর্ঘদিন ফিলিস্তিন স্বীকৃতির বিষয়ে অনিশ্চিত থাকলেও গাজার শিশুদের মৃত্যুর মর্মান্তিক দৃশ্য যুক্তরাজ্যের জনমত ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। লেবার পার্টি ও ফরেন অফিসে মনোভাব বদলেছে দৃশ্যমানভাবে।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর স্বীকৃতি ইসরায়েলকে কূটনৈতিকভাবে আরও কোণঠাসা করে তুলেছে। সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই ইস্যু কেন্দ্রীয়ভাবে আলোচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিউ ইয়র্কের সম্মেলনে, যা পরিচালনা করেছে ফ্রান্স ও সৌদি আরব, একটি সাত পৃষ্ঠার প্রস্তাবপত্র গৃহীত হয়েছে, যেখানে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা জানিয়ে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য সেই বহু পুরনো ও বন্ধ হয়ে যাওয়া শান্তির পথকে আবারও খুলে দিতে চাইছে।
সূত্র: বিবিসি
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন