জাপানের সদ্য অনুষ্ঠিত উচ্চকক্ষ নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থি সানসেইতো পার্টি (Sanseito) অন্যতম বড় বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অভিবাসীদের ‘নীরব আগ্রাসন’ নিয়ে সতর্কবার্তা এবং কর ছাড় ও কল্যাণ ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ইউটিউবে জন্ম নেওয়া এই দলটি শুরুতে টিকা এবং বৈশ্বিক অভিজাত শ্রেণি নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ানোর মাধ্যমে পরিচিতি পায়। এবার “জাপানিজ ফার্স্ট” (Japanese First) স্লোগানকে সামনে রেখে তারা মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে।
এবারের নির্বাচনে সানসেইতো ১৪টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা তিন বছর আগে উচ্চকক্ষের ২৪৮টি আসনের মধ্যে একটিতে জয়ী হওয়ার তুলনায় বিশাল অগ্রগতি। যদিও নিম্নকক্ষে দলটির মাত্র তিনটি আসন রয়েছে।
দলটির নেতা সোহেই কামিয়া (৪৭) স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেলকে বলেন, “জাপানিজ ফার্স্ট বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছি, বৈশ্বিকতাবাদকে প্রতিরোধ করে জাপানিদের জীবিকা পুনর্গঠন করা। আমি বলছি না যে সব বিদেশিকে নিষিদ্ধ করা উচিত বা তারা জাপান ছেড়ে চলে যাক।”
প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা’র নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং এর জোটসঙ্গী কোমেইতো উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, যা আগের নিম্নকক্ষ নির্বাচনের পরাজয়ের ধারাবাহিকতা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জাপান সোসাইটির প্রধান জোশুয়া ওয়াকার বলেন, “সানসেইতো এখন আলোচনার কেন্দ্রে, বিশেষ করে আমেরিকায়, এর জনপ্রিয়তা উগ্র জনতাবাদ ও বিদেশিবিরোধী মনোভাবের কারণে। এটি এলডিপি এবং ইশিবার দুর্বলতারই প্রতিফলন।”
এনএইচকে'র এক জরিপ অনুযায়ী, ২৯% ভোটার সামাজিক নিরাপত্তা এবং জন্মহার কমে যাওয়াকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখেছেন। ২৮% বলেছেন, ধানের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ায় তারা চিন্তিত। অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন মাত্র ৭%।
তবে কামিয়া বলেন, “আমাদেরকে বিদেশিবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক বলা হয়েছিল। কিন্তু জনগণ বুঝেছে মিডিয়া ভুল ছিল, সানসেইতো ঠিক ছিল।”
কামিয়া জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “সাহসী রাজনৈতিক স্টাইল” তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি ইউরোপের উগ্রপন্থি দলগুলোর মতো ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের পরিকল্পনাও করছেন।
নির্বাচনের কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রী ইশিবার সরকার বিদেশিদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে একটি নতুন টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেয় এবং “অবৈধ বিদেশি শূন্য” লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
২০২২ সালে দলটির প্রথম আসনে জয়ী হওয়া কামিয়া একসময় জাপানের সম্রাটকে উপপত্নী রাখার প্রস্তাব দিয়ে সমালোচিত হন। যদিও সম্প্রতি তিনি দলটির বিতর্কিত অবস্থান কিছুটা নমনীয় করেছেন। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় লিঙ্গ সমতা নীতিকে "ভুল" বলে আখ্যা দিয়ে নারী কর্মীদের কর্মজীবনে উৎসাহ দেওয়া সন্তান জন্মে বাধা সৃষ্টি করে বলেও মন্তব্য করেন, যা সমালোচনার জন্ম দেয়।
নিজের ‘তাপসস্বভাব’ ইমেজ সফট করতে এবং তরুণ পুরুষ ভোটারদের বাইরেও সমর্থন বিস্তারের জন্য তিনি এবার বহু নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেন, যার মধ্যে গায়িকা ‘সায়া’ টোকিও থেকে একটি আসন জিতে নেন।
অন্যান্য বিরোধী দলের মতো সানসেইতোও কর ছাড় ও শিশু ভাতা বৃদ্ধির দাবি তুলেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জাপানের বিশাল ঋণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে দলটির ইউটিউব উপস্থিতি সবচেয়ে শক্তিশালী—এর অনুসারী সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ, যা এলডিপির তিনগুণ।
নির্বাচনের পর কামিয়া বলেন, “আমরা ধীরে ধীরে আমাদের আসন সংখ্যা বাড়াচ্ছি এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করছি। একটি শক্ত সংগঠন গড়ে ৫০ বা ৬০টি আসন নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের নীতিগুলো বাস্তবে রূপ নেবে।”
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন