বর্তমানে হৃদরোগ শুধু বয়স্কদের সমস্যা নয়। ৩০-৪০ বছর বয়সী তরুণরাও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ এবং অনিয়মিত ঘুম এই ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগেভাগে সচেতন না হলে হৃদয় দেবে ‘নীরব’ হুমকি—যার ফল হতে পারে প্রাণঘাতী।
মানসিক চাপ কড়া নাড়ে না, সে দীর্ঘ সময় ধরে রয়ে যায়। আজকের ব্যস্ত ও দ্রুতগতির জীবনে, কর্মস্থলের কঠোর সময়সীমা, বাড়তে থাকা খরচ, সোশ্যাল মিডিয়ার অবিরাম নোটিফিকেশন ও যানজট—এই সব মিলিয়ে মানসিক চাপ অনেকের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চাপ শুধু মানসিক নয়, নীরবে হৃদয়ের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
নির্বাক এই হুমকি নিয়ে সম্প্রতি হিন্দুস্তান টাইমস-এ এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছেন ভারতের ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের কার্ডিওভাসকুলার ও অ্যাওর্টিক সার্জন ডা. নিরঞ্জন হিরেমাঠ।
তরুণ বয়সেই হৃদরোগ!
সাধারণত মনে করা হতো, হৃদরোগ ৫০ বছর বয়সের পরের চিন্তা। কিন্তু এখন ৩০ বা ৪০-এর কোঠায় থাকা অনেক সুস্থদর্শন মানুষও দেখাচ্ছেন হৃদযন্ত্রের প্রাথমিক সমস্যা। অনিয়মিত ঘুম, অনিয়ন্ত্রিত খাবার, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকা এবং কাজের চাপ তরুণদের মধ্যেই বাড়িয়ে তুলছে হৃদরোগের ঝুঁকি।
চিকিৎসকরা বলছেন, এমনকি যাদের পারিবারিক ইতিহাসে হৃদরোগ নেই, তারাও ঝুঁকিতে আছেন যদি তাদের জীবনধারা থাকে অলস, স্ট্রেস-যুক্ত ও অনিয়মিত।
নীরব হার্ট অ্যাটাকের প্রকোপ
ডা. হিরেমাঠ জানান, বর্তমানে নীরব হার্ট অ্যাটাক বা আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঘটনা বাড়ছে। এগুলোর উপসর্গ এতটাই অস্পষ্ট—যেমন হালকা অস্বস্তি, গ্যাস্ট্রিক মনে হওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি—যে মানুষজন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এসবই হতে পারে হৃদয়ের বিপদের আগাম বার্তা।
কফি, সিগারেট নয়, জীবনধারায় পরিবর্তন জরুরি
অনেকেই দীর্ঘ কর্মদিবসের পর কফি, সিগারেট বা জাঙ্ক ফুডে স্বস্তি খোঁজেন। কিন্তু এসব তাৎক্ষণিক মুক্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে হৃদয়ের ক্ষতি করে। এর বদলে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে সচেতন জীবনধারার:
- পুষ্টিকর খাবার
- নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম (কমপক্ষে ৩০ মিনিট)
- যথাযথ ঘুম
- স্ক্রিন থেকে বিরতি
- যোগব্যায়াম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন
পূর্ব সতর্কতা ও নিয়মিত পরীক্ষার গুরুত্ব
চিকিৎসকরা মনে করেন, বুক ধড়ফড় করা বা ব্যথা হওয়ার আগেই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল আছে, তাদের জন্য বার্ষিক হার্ট চেক-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ কিছু পরীক্ষা যেমন ইসিজি, লিপিড প্রোফাইল বা ট্রেডমিল টেস্ট অনেক বড় বিপদকে আগেভাগে চিনে ফেলতে পারে।
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় প্রতিকার
ভারতে বর্তমানে প্রতি চারটি মৃত্যুর একটি ঘটছে হৃদরোগে। ভয়াবহ বিষয় হলো, এখন এই রোগ তরুণদের মধ্যেও মারাত্মক আকার নিচ্ছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রতিদিনের দৌড়ঝাঁপের মাঝেও নিজেকে সময় দেওয়া, মানসিক চাপ কমানো ও নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো—এই অভ্যাসগুলো জীবন রক্ষা করতে পারে।
"প্রতিরোধ শুধু চিকিৎসার চেয়ে ভালো নয়, এটি একমাত্র জিনিস যা আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি," — বলেন ডা. হিরেমাঠ।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন