প্রিয়জন, বন্ধু কিংবা পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেলে কার না ভালো লাগে? আর সেই সময় যদি কাটে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, ঠান্ডা বাতাস ও মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে, তাহলে ভ্রমণের আনন্দ হয়ে ওঠে আরও উপভোগ্য। শীতকালকে বলা হয় ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণপ্রেমীদের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ সমুদ্রের টানে ছুটে যান, কেউ পাহাড়ের মেঘ দেখতে পছন্দ করেন। আবার অনেকের পছন্দ চা-বাগান, বন কিংবা নদীঘেরা নিরিবিলি পরিবেশ।
বাংলাদেশে রয়েছে অসংখ্য প্রাকৃতিক ও দর্শনীয় স্থান। শীতের ছুটিতে সময় বের করে এসব জায়গার মধ্যে পছন্দের কোনো গন্তব্যে কয়েক দিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন।
১. সেন্ট মার্টিন দ্বীপ
‘দ্বারুচিনি দ্বীপ’ নামে পরিচিত সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। নীল সমুদ্র, প্রবাল, সারি সারি নারিকেলগাছ এবং সমুদ্রপথে ভ্রমণের রোমাঞ্চ—সবকিছু মিলিয়ে দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। কক্সবাজারের টেকনাফের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপ শীতের ছুটিতে ঘুরে আসার জন্য চমৎকার একটি জায়গা। তবে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত সারা বছর চালু থাকে না। দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটন মৌসুমে ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছরের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিদিন গড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক সেখানে যেতে পারবেন। এ জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে।
২. কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত
শীতের ভ্রমণের পরিকল্পনায় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য কক্সবাজার। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এই সৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। সমুদ্রের নীল জলরাশি, বিস্তৃত বালুকাবেলা এবং মনোরম সূর্যাস্তের দৃশ্য প্রতিনিয়ত পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। কক্সবাজারে গেলে মূল সৈকতের পাশাপাশি হিমছড়ি, ইনানী, দরিয়ানগর ও মেরিন ড্রাইভ ঘুরে দেখতে পারেন। সমুদ্রের পাড়ে হাঁটাহাঁটি, ঘোড়ায় চড়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে আরও আনন্দময়।
৩. সাজেক ভ্যালি
পাহাড়ের ওপর থেকে মেঘের ভেলা দেখার স্বপ্ন থাকলে সাজেক ভ্যালি হতে পারে আপনার পছন্দের গন্তব্য। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্র পাহাড়, সবুজ বন, মেঘ এবং আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়কের জন্য পরিচিত।
শীতের সকালে পাহাড়ের গা বেয়ে মেঘের চলাচল, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য সাজেকের অন্যতম আকর্ষণ। এখানে ঘুরে দেখতে পারেন কংলাক পাহাড়, রুইলুই পাড়া এবং আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
৪. শ্রীমঙ্গল
সবুজ চা-বাগান, কুয়াশায় ঢাকা সকাল এবং নিরিবিলি পরিবেশের কারণে শ্রীমঙ্গল পরিচিত ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে। মৌলভীবাজার জেলার এই পর্যটন অঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে গেলে চা-বাগানের ভেতরের পথ ধরে হাঁটতে পারেন। পাশাপাশি ঘুরে দেখতে পারেন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাইক্কা বিল ও মাধবপুর লেক। স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
৫. জাফলং
পাহাড়, নদী ও পাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে সিলেটের জাফলং হতে পারে আদর্শ জায়গা। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পিয়াইন নদী। নদীর স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ও পাথরের মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। শীতের আরামদায়ক আবহাওয়ায় নদীর তীরে সময় কাটানো, ছবি তোলা এবং পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। জাফলং ভ্রমণের পাশাপাশি সিলেটের বিছানাকান্দি, রাতারগুল ও লালাখালও ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।
৬. সুন্দরবন
বন্য প্রকৃতি, নদী-খাল এবং ম্যানগ্রোভ বনের রহস্যময় পরিবেশের স্বাদ নিতে চাইলে সুন্দরবন হতে পারে ব্যতিক্রমী ভ্রমণ গন্তব্য। বাংলাদেশ ও ভারতের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে থাকা এই বন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এটি। শীতকালে নৌপথে সুন্দরবন ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। এ সময় করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা ও কচিখালীর মতো পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ করতে পারেন। বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ, হরিণ, পাখি এবং নানা বন্যপ্রাণীর বিচিত্র জীবন কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখতে পারে।
৭. রাঙামাটি
পাহাড়, হ্রদ ও সবুজ প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয় দেখতে চাইলে রাঙামাটি হতে পারে দারুণ একটি গন্তব্য। কাপ্তাই হ্রদের নীল জল, পাহাড়ি পথ এবং ঝুলন্ত সেতু এ জেলার অন্যতম পরিচিত আকর্ষণ। রাঙামাটি ভ্রমণে কাপ্তাই হ্রদে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি শুভলং ঝরনা, পেদা টিং টিং ও ঝুলন্ত সেতু দেখতে পারেন। পাহাড় ও হ্রদের মনোরম পরিবেশ পর্যটকদের কাছে জায়গাটিকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
৮. বান্দরবান
পাহাড়, ঝরনা ও আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বান্দরবান পর্যটকদের কাছে সুপরিচিত। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি কিছু সময় কাটাতে চাইলে এই জেলা হতে পারে চমৎকার ভ্রমণ গন্তব্য। বান্দরবানে নীলাচল, নীলগিরি, চিম্বুক পাহাড় ও শৈলপ্রপাত বেশ জনপ্রিয় পর্যটনস্থান। পাহাড়ের ওপর থেকে মেঘের দৃশ্য, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
৯. কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত
একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ থাকায় ‘সাগরকন্যা’ নামে পরিচিত কুয়াকাটা পর্যটকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত এই সমুদ্রসৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ কিলোমিটার। শীতের সকালে সমুদ্রের বুক থেকে সূর্য ওঠার দৃশ্য কিংবা বিকেলে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারেন। সৈকতের বালুকাবেলায় হাঁটাহাঁটির পাশাপাশি ঘুরে দেখতে পারেন ফাতরার বন, লেবুর চর, গঙ্গামতি ও রাখাইন পল্লী।
১০. পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া
শীতের ভ্রমণে দেশের উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় জেলা এবং সীমান্তবর্তী তেঁতুলিয়া হতে পারে আকর্ষণীয় গন্তব্য। বিশেষ করে তেঁতুলিয়া থেকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য বছরের নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আকাশ পরিষ্কার থাকলে পর্বতশৃঙ্গটি দেখা যায়। এ ছাড়া শীতের তীব্রতা অনুভব করতে আগ্রহীদের কাছেও এই অঞ্চল বেশ আকর্ষণীয়।
পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া ভ্রমণে সমতলের চা-বাগান, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, মহারাজার দিঘি এবং ভিতরগড়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।
ভ্রমণের আগে কিছু প্রস্তুতি
শীতের ছুটিতে ভ্রমণে যাওয়ার আগে যাতায়াত, আবাসন ও অন্যান্য খরচের হিসাব করে পরিকল্পনা সাজিয়ে নেওয়া ভালো। ছুটির দিনগুলোতে পর্যটনকেন্দ্রে ভিড় বেশি থাকে। তাই হোটেল এবং পরিবহনের টিকিট আগেভাগে বুকিং করলে ভোগান্তি কম হবে। পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। সমুদ্র কিংবা নদীতে নামার সময় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বনাঞ্চল ও দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি দিন হয়ে উঠতে পারে বছরের অন্যতম সুন্দর স্মৃতি। তাই শীতের ছুটিতে নিজের সময় ও সামর্থ্য অনুযায়ী বেছে নিন পছন্দের পর্যটনস্থান। নতুন পরিবেশ, প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ুন ভ্রমণে।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন