দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে টু-জি প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শুধু টু-জি সমর্থিত বাটন ফোন দিয়ে আর প্রচলিত মোবাইল নম্বরে কল করা যাবে না। তবে ভোল্টি (VoLTE) প্রযুক্তি সুবিধাসম্পন্ন বাটন ফোন ব্যবহারকারীরা আগের মতোই কল করতে পারবেন। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬ কোটি ১৩ লাখ গ্রাহক টু-জি ফোন ব্যবহার করছেন। এসব ফোনের অধিকাংশেই ভোল্টি প্রযুক্তি নেই। ফলে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে নতুন হ্যান্ডসেট কিনতে হতে পারে। তাদের জন্য কম দামে বিকল্প ফোনের ব্যবস্থা করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। গত অক্টোবরে মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট প্রস্তুতকারকসহ টেলিযোগাযোগ খাতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তৈরি করেছে বিটিআরসি।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পর নতুন কোনো টু-জি হ্যান্ডসেটের মডেল অনুমোদন দেওয়া হবে না। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ থেকে টু-জি ফোন উৎপাদন বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই বছরের ৩০ জুনের পর এসব ফোন বাজারজাত করাও বন্ধ করা হবে। সর্বশেষ ধাপে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে টু-জি সেবা পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিটিআরসির পরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমে টু-জি প্রযুক্তিনির্ভর ফোনের ব্যবহার বন্ধ করে গ্রাহকদের আধুনিক নেটওয়ার্কে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। তবে এই রোডম্যাপ কার্যকর করতে সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন। টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে ভোল্টি প্রযুক্তি নেই—এমন ফোন থেকে সাধারণ ভয়েস কল করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, ভোল্টি সুবিধাসম্পন্ন বাটন ফোনে সরাসরি কল করার সুযোগ থাকবে।
ভোল্ট বা ভয়েস ওভার লং টার্ম ইভোলিউশন এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে টু-জি কিংবা থ্রি-জি নেটওয়ার্কের পরিবর্তে ফোরজি বা এলটিই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভয়েস কল করা যায়। অর্থাৎ, এ সুবিধা থাকা ফোন থেকে হোয়াটসঅ্যাপের মতো আলাদা কোনো ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপ ছাড়াই সরাসরি মোবাইল নম্বরে কল করা সম্ভব। গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, গ্রাহকদের মধ্যে এখন হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ওটিটি অ্যাপ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ভোল্টি প্রযুক্তির ব্যবহারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। তিনি জানান, টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলেও মোবাইলে কথা বলার সুযোগ থাকবে। তখন ওটিটি অ্যাপ অথবা ভোল্টি প্রযুক্তির মাধ্যমে কল করা যাবে। বাটন ফোনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, বাজারে এখনো কিছু ফোরজি ফোন রয়েছে, যেগুলোতে শুধু ভোল্টি সুবিধা পাওয়া যায়।
টেলিযোগাযোগ খাতের কর্মকর্তাদের মতে, এ পরিবর্তনের ফলে মূলত শুধু টু-জি সমর্থিত বাটন ফোনগুলোই অচল হয়ে পড়বে। কারণ, এসব হ্যান্ডসেটে ফোরজি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সক্ষমতা নেই। রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, যেসব হ্যান্ডসেট কেবল টু-জি প্রযুক্তি সমর্থন করে এবং যেগুলোর ব্যবহারকাল তিন থেকে চার বছর, সেগুলোর উৎপাদন বন্ধ করতে নির্মাতাদের নির্দেশনা দিয়েছে বিটিআরসি। আগামী বছর থেকে নতুন টু-জি ফোন তৈরি বন্ধ হলে ২০৩০ সাল নাগাদ মানুষের হাতে এ ধরনের হ্যান্ডসেট আর থাকবে না বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তখন ভোল্টি প্রযুক্তি অথবা বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস কল করা যাবে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, দেশটিতে বর্তমানে টু-জি নেটওয়ার্ক চালু নেই। সেখানে ভোল্টি প্রযুক্তি ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল যোগাযোগ করা হয়।
সাহেদ আলমের ভাষ্য, ইন্টারনেট ডেটা ব্যবহার করে কল করলে প্রচলিত ভয়েস কলের তুলনায় খরচ কয়েক গুণ কম হতে পারে। এ কারণেই ব্যবহারকারীদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপের কল ও ভোল্টি প্রযুক্তির কল এক নয়। ভোল্টি ব্যবহার করে সরাসরি যেকোনো প্রচলিত মোবাইল নম্বরে ফোন করা যায়। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপ দিয়ে কথা বলতে হলে দুই পক্ষেরই সংশ্লিষ্ট অ্যাপ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডেটা ব্যবহারের সুবিধা থাকতে হয়। এদিকে, বিপুলসংখ্যক টু-জি ফোন ব্যবহারকারীর জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমানে বাজারে প্রায় এক হাজার টাকায় সাধারণ বাটন ফোন পাওয়া যায়। বিপরীতে স্মার্টফোনের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। দেশীয় হ্যান্ডসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিম্ফনির স্বত্বাধিকারী এডিসন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওএবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, হ্যান্ডসেটের সঙ্গে ভয়েস ও ডেটা সুবিধা যুক্ত করে আকর্ষণীয় প্যাকেজ চালু করা গেলে গ্রাহকদের ফোরজি ফোন ব্যবহারে আগ্রহী করা সম্ভব। পাশাপাশি কিস্তিতে ফোন কেনার ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।
তার মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রাহকদের টু-জি থেকে ফোরজি নেটওয়ার্কে স্থানান্তর সহজ হবে। এ জন্য মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যদিকে, সরকারও দেশে স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোন উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬ সম্মেলনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভুঁঞা জানান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের পাশাপাশি সাশ্রয়ী স্মার্টফোনের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
তিনি বলেন, দেশে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কম দামে স্মার্টফোন বাজারে এলেই সব শ্রেণির গ্রাহকের পক্ষে টু-জি থেকে ফোরজিতে যাওয়া সহজ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে যারা শুধু কথা বলা, রেডিও শোনা কিংবা টর্চ ব্যবহারের জন্য বাটন ফোন ব্যবহার করেন, তাদের কাছে অতিরিক্ত ফিচারের চেয়ে ফোনের দামই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বর্তমানে বাজারে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে সাধারণ বাটন ফোন পাওয়া যায়। এসব ফোনে কথা বলার পাশাপাশি টর্চ লাইট, মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে গান শোনা এবং এফএম রেডিও ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। কিছু হ্যান্ডসেটে সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও পাওয়া যায়। এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে কম অভ্যস্ত অনেকের কাছে স্মার্টফোনের টাচস্ক্রিন ব্যবহার স্বাচ্ছন্দ্যকর নয়। তাদের জন্য বাটন ফোনই বেশি পরিচিত ও সহজ মাধ্যম। ফলে টু-জি বাটন ফোনের ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ কার্যকর হলে এই গ্রাহকদের একটি অংশও নতুন ফোন ব্যবহারে সমস্যার মুখে পড়তে পারেন।
স্টাফ রির্পোটার
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন