প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে কিংবা তাঁর সম্মতি ছাড়াই কি দ্বিতীয় বিয়ে করা যায়? এ প্রশ্ন নিয়ে অনেকের মধ্যেই রয়েছে বিভ্রান্তি। ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি আছে, কিন্তু সেই অনুমতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব পালনের কঠোর শর্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন বলছে, প্রথম বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তাহলে ধর্মীয় বিধান ও দেশের আইনের মধ্যে বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে?
ইসলামি শরিয়তের সাধারণ ফিকহি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া কিংবা তাঁকে আগে থেকে জানানো বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। মিসরের সরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দারুল ইফতার এক ফতোয়াতেও বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি বাধ্যতামূলক নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, স্বামী ইচ্ছামতো একাধিক বিয়ে করতে পারবেন কিংবা স্ত্রীদের অধিকার উপেক্ষা করতে পারবেন। ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতির সঙ্গে ন্যায়বিচারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার তিন নম্বর আয়াতে দুই, তিন কিংবা চারজন নারীকে বিয়ের অনুমতির কথা বলা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজনকেই বিয়ে করতে হবে। অর্থাৎ একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের ভরণপোষণ, অধিকার এবং প্রাপ্য বিষয়ে ন্যায়সংগত আচরণ করা স্বামীর দায়িত্ব। কোনো বিয়ের চুক্তিতে দ্বিতীয় বিয়ে না করার শর্ত দেওয়া থাকলে, স্বামী সেই শর্ত মেনে থাকলে সেটি পালনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এবার আসা যাক বাংলাদেশের আইনে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ছয় নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, আগের বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় কোনো পুরুষ সালিশি পরিষদের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। এই অনুমতি পেতে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হয়। আবেদনে দ্বিতীয় বিয়ের কারণ এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হয়।
এরপর সালিশি পরিষদ আবেদনকারী এবং তাঁর বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রতিনিধিদের বক্তব্য বিবেচনা করে। দ্বিতীয় বিয়েটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত মনে হলেই কেবল অনুমতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন স্বামী। আইন অনুযায়ী, বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্পূর্ণ বকেয়া দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
সুতরাং বিষয়টি হলো, ইসলামি ফিকহের সাধারণ ব্যাখ্যায় প্রথম স্ত্রীর সম্মতি দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতার শর্ত নয়। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে সালিশি পরিষদের লিখিত পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। ধর্মীয় অনুমতি থাকলেও দেশের প্রচলিত আইন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আর একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও প্রত্যেক স্ত্রীর অধিকার নিশ্চিত করা স্বামীর অপরিহার্য দায়িত্ব।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন