এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিদেশি বিনিয়োগ টানা, রপ্তানি বাজার বিস্তৃত করা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানো এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতা নিশ্চিত করতে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। এই লক্ষ্য শুধু দেশের মোট অর্থনীতির আকার বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, দক্ষ মানবসম্পদ, জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এরই মধ্যে ইতালিসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশে প্রশিক্ষক তৈরির পাশাপাশি ইতালিতে কর্মসংস্থানে আগ্রহী দক্ষ কর্মীদের ভাষাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়াতে তৃতীয় ভাষা শেখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইতালীয় ভাষা শিক্ষায় সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ এবং নগর ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যেও বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নেওয়া সংস্কার উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা। জেনেভায় সংস্থাটির বিনিয়োগ, উদ্যোগ ও উন্নয়ন কমিশনের অধিবেশনে বাংলাদেশ ও তিউনিশিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৬২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বিনিয়োগ গ্রহণকারী দেশই পেয়েছে মোট বৈশ্বিক বিনিয়োগের ৮০ শতাংশের বেশি।
এ অবস্থায় শুধু বিদেশি বিনিয়োগ আনা নয়, কোন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে এবং সেই বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিতে কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো, অর্ধপরিবাহী, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও জ্বালানি রূপান্তর প্রযুক্তির মতো কৌশলগত খাতে ২০২৫ সালে ঘোষিত নতুন শিল্পভিত্তিক বিনিয়োগের ৪৪ শতাংশ গেছে। ২০২০ সালে এ হার ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে নিয়ন্ত্রক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অনলাইন সেবা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সমন্বয় তৈরির চেষ্টা রয়েছে। এই অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বিদেশ সফরের পরিকল্পনাতেও। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, সৌদি আরবের রিয়াদ, কাতারের দোহা, জাপানের টোকিও এবং তুরস্কের আনতালিয়ায় সফরের প্রস্তুতি চলছে।
সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এবার বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন এবং ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অর্থ পাচার এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়টি আলাদাভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
এর পাশাপাশি তুরস্কের আনতালিয়ায় জলবায়ু সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ৯ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত মূল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বনেতাদের বৈঠক হবে ১১ ও ১২ নভেম্বর। সৌদি আরব, কাতার ও জাপান সফরের সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময়ে সফরের তারিখ নির্ধারণের কাজ চলছে।
এই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পেছনে রয়েছে সরাসরি অর্থনৈতিক স্বার্থ। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। দেশটিতে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সৌদি প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে বাংলাদেশে ১৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সম্মত হয়েছে বলেও তথ্য রয়েছে।
কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বড় ভিত্তি জ্বালানি ও শ্রমবাজার। কাতার থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু প্রবাসী কর্মী বা বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও। অন্যদিকে, জাপান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মেট্রোরেল, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বড় প্রকল্পে জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা রয়েছে।
গত জুলাইয়ে জাপানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, গণপরিবহন, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়তার মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে চীনের রপ্তানি বড় ধাক্কা খেলেও বাংলাদেশ চীনের তুলনায় সামান্য এগিয়ে রয়েছে।
তবে এই অর্জনের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। শুধু জুলাই মাসেই কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যেমন নতুন সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি রপ্তানি ধরে রাখতেও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য এখন শুধু একটি উচ্চাভিলাষী ঘোষণা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, দক্ষ জনশক্তি, রপ্তানি এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমন্বিত পরিকল্পনা। বিদেশ সফর থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের কৌশল স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখন বড় প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কতটা দ্রুত নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন