এশার নামাজ শেষে মুসল্লিরা যে যার বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর ফজরের নামাজ পড়তে এসে তারা দেখলেন—যেখানে রাতেও দাঁড়িয়ে ছিল মসজিদ, সেখানে এখন শুধু উত্তাল পদ্মার পানি। পুরো ইমাম আবু হানিফা জামে মসজিদই চলে গেছে নদীর গর্ভে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার দেওয়ানকান্দি, রাকিরকান্দি ও পূর্বরাখী এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোতে পদ্মা এখন উত্তাল। তীব্র স্রোতের আঘাতে একের পর এক বসতভিটা, স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নদীর গর্ভে বিলীন হচ্ছে।
ভাঙন ঠেকাতে আগে থেকেই পদ্মার পাড়ে বালুর বস্তা ফেলে অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনের তীব্র স্রোতে সেই প্রতিরোধব্যবস্থার বড় অংশও ধসে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনো বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে নদীর স্রোত এতটাই শক্তিশালী যে অস্থায়ী বাঁধ টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাকিরকান্দি এলাকার মাদানী কমপ্লেক্স মাদ্রাসায়। গত দুই দিনের ভাঙনে মাদ্রাসার ইমাম আবু হানিফা জামে মসজিদটি পুরোপুরি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। যে মসজিদে শুক্রবার রাতে মুসল্লিরা এশার নামাজ আদায় করেছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর ফজরের সময় সেখানে গিয়ে মসজিদের কোনো চিহ্নই আর দেখতে পাননি।
মাদ্রাসার ছাত্র সোহেল জানান, এশার নামাজের পর তারা মাদ্রাসার ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালে ফজরের নামাজ পড়তে এসে দেখেন মসজিদটি নদীতে ভেঙে গেছে। এখন তাদের মাঠে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। স্থানীয় সাবেক জনপ্রতিনিধি মিজানুর রহমান দুদুর অভিযোগ, কয়েক বছর আগেও সেখানে ছোট একটি নদী ছিল। কিন্তু ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটার কারণে নদীটি আরও গভীর ও প্রশস্ত হয়েছে। এতে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে এবং এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাদ্রাসার অনেক অংশ ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতি বছর মাদানী কমপ্লেক্সে মাহফিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। কিন্তু মাহফিলের মাঠটিও এখন নদীতে হারিয়ে গেছে। শুধু মসজিদ নয়, আশপাশের বহু বাড়িঘরও পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার নদীগুলোতে পানির স্তর বাড়ার প্রবণতা রয়েছে এবং নদীতে তীব্র স্রোত বইছে। তবে পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। গত কয়েক দিনে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সদর উপজেলার পাশাপাশি টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বানারী এলাকাতেও ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেখানে বিলীন হচ্ছে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা। নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে ছোট নৌযান চলাচলেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, গত পাঁচ বছর ধরে মাদানী কমপ্লেক্স এলাকায় কমবেশি নদীভাঙন চলছে। মাদ্রাসার প্রায় পুরো জমিই ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কথা বলা হলেও এখনো সেই ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। ফলে নদীর স্রোত বাড়লেই নতুন করে আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
ভাঙনকবলিত দেওয়ানকান্দি এলাকা রোববার বিকেলে পরিদর্শন করেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন ও জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী। এ সময় বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকাতে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ উদ্বোধন করা হয়। জেলা প্রশাসক নুর মহল আশরাফী জানান, ভাঙনরোধে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের নিয়ে ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা প্রায় ৪০০ মিটার এলাকায় কাজ করা হচ্ছে।
সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। তীব্র স্রোতে একটি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, পদ্মা নদীতে পানির স্রোত বেড়ে যাওয়ার কারণেই ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই—অস্থায়ী বালুর বাঁধ দিয়ে আর কতদিন ঠেকানো যাবে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন? কারণ রাতের অন্ধকারে যে মসজিদে মানুষ নামাজ আদায় করছেন, ভোর হওয়ার আগেই সেটি হারিয়ে যাচ্ছে নদীর গর্ভে। আর প্রতিদিনই পদ্মার পাড়ে বসবাস করা মানুষ হারাচ্ছেন তাদের ঘরবাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিনের স্মৃতি। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হলে এই ভাঙন আরও কত স্থাপনা কেড়ে নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন