টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গাইবান্ধায় আমন ধানের বীজতলা পানিতে ডুবে পচে নষ্ট হয়েছে। ফলে জমিতে আমন ধান রোপণ করতে গিয়ে নতুন করে চারা কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়ছে চাষের খরচ। বাড়তি এই ব্যয় মিটিয়ে ধান বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই ওঠানো কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের হবিবুল্লাপুর গ্রামের বর্গাচাষি রাঙ্গা মোল্লা জানান, তিনি প্রায় ১০ শতক জমিতে আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টির পানিতে সেটি ডুবে গিয়ে পচে নষ্ট হয়েছে। এখন তিন বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণের জন্য হাট থেকে চারা কিনতে হচ্ছে তাকে।
তিনি জানান, প্রতি দশ আঁটি চারা প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে কিনেছেন। এর সঙ্গে হাটের টোল, বাড়িতে চারা নিয়ে যাওয়ার পরিবহন খরচ, জমি চাষ, চারা রোপণের শ্রমিকের মজুরি, সার, কীটনাশক ও আগাছা পরিষ্কারের খরচ যোগ হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার আমন চাষে যে ব্যয় হবে, ধান বিক্রি করে সেই টাকা উঠবে কি না, তা নিয়েই শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধায় চলতি মৌসুমে প্রায় এক লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমির জন্য প্রায় ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে জেলার ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর। তবে কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিম্নাঞ্চলের অনেক বীজতলা দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় চারাগুলো পচে গেছে। কোথাও কোথাও পানি দ্রুত নেমে গেলেও অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে বীজতলা থেকে পানি সরতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল সোবহান মিয়া জানান, প্রায় আট বিঘা জমিতে আমন চাষের জন্য ২৫ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। প্রায় ২০ থেকে ২২ দিনের চারা এক সপ্তাহ পানির নিচে থাকায় সব পচে যায়। এখন বাধ্য হয়ে বেশি দামে হাট থেকে চারা কিনে জমিতে রোপণ করছেন তিনি।
কৃষকদের অভিযোগ, জেলার অনেক খাল-বিল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশন হতে পারছে না। কোথাও খাল-বিলে মাছ চাষ বা ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে, আবার কোথাও পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সড়কের সেতু ও কালভার্টের মুখ বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে পারছে না বলেও অভিযোগ কৃষকদের। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনার দাবি উঠেছে। সুন্দরগঞ্জের কৃষক ওসমান গনি বলেন, দ্রুত প্রণোদনার ব্যবস্থা না করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পক্ষে এ বছর ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। একই দাবি জানিয়েছেন গাইবান্ধা সদরের বর্গাচাষি সৈয়দ আলীও।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বীজতলা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আগামী রবি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বীজ ও সার দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে, একদিকে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলা, অন্যদিকে নতুন করে চারা কিনতে গিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। ফলে সময়মতো আমন আবাদ শেষ হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন গাইবান্ধার কৃষকেরা।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন