একসময় চট্টগ্রামের অর্থনীতি, বন্দর কার্যক্রম ও জনজীবনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী নদী এখন ভয়াবহ দূষণ ও দখলের সংকটে জর্জরিত। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশনের ময়লা, প্লাস্টিক-পলিথিন এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের অবাধ প্রবাহে নদীটির পরিবেশগত ভারসাম্য দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় কর্ণফুলীর ৭৯টি স্থানে দূষণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অধিকাংশ এলাকাতেই দূষণের মাত্রা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চট্টগ্রাম নগরীর অসংখ্য খাল বর্তমানে বর্জ্য পরিবহনের নালায় পরিণত হয়েছে, যা সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, নদীতীরবর্তী বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কারখানা, তেলজাত শিল্প এবং অন্যান্য উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিজমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকও বৃষ্টির পানির সঙ্গে নদীতে এসে দূষণ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এতে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ছে।
প্লাস্টিক দূষণও কর্ণফুলীর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ও পলিথিন নদীতে জমা হয়ে তলদেশ ভরাট করছে। এতে নদীর নাব্যতা কমছে এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনার সময়ও নদীর তলদেশে পুরু প্লাস্টিকের স্তর পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। সরেজমিনে নদীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিক, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যের স্তূপ দেখা গেছে। অনেক খাল দিয়ে কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত দূষিত পানি সরাসরি নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্ণফুলীকে রক্ষা করতে হলে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নদী ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন