দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এলাকায় জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই দূষিত কালো পানিতে নামছেন শতাধিক নারী। কয়লাখনির ড্রেন দিয়ে ভেসে আসা কয়লার গুঁড়া ও ছোট ছোট টুকরো সংগ্রহ করেই চলছে তাদের সংসার। স্থানীয়দের কাছে এই কয়লার গুঁড়াই পরিচিত ‘কালো সোনা’ নামে। খনি সংলগ্ন চৌহাটি ও শাহগ্রাম এলাকার বহু নারী প্রায় দুই দশক ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। কেউ স্বামীর অসুস্থতার কারণে, কেউ স্বজন হারানোর পর, আবার কেউ চরম দারিদ্র্যের চাপে বাধ্য হয়ে নেমেছেন এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়। কোমর থেকে গলা সমান পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তারা কয়লার গুঁড়া সংগ্রহ করেন।
বর্তমানে আটটি দলে ভাগ হয়ে প্রায় আড়াই শতাধিক নারী পালাক্রমে কাজ করছেন। একেকটি শিফট চলে টানা ২৪ ঘণ্টা। সংগৃহীত কয়লার গুঁড়া শুকিয়ে স্থানীয় ইটভাটায় বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে দৈনিক গড়ে ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়, যা অনেক পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস। কর্মরত নারীদের ভাষ্য, সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই তাদের এই কষ্টকর কাজ করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় দূষিত পানিতে থাকার কারণে অনেকেই চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছেন। তবুও বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় কাজ ছাড়ার সুযোগ নেই তাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর এই কাজে যুক্ত থাকলেও শ্রমিকদের জন্য নেই কোনো স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা। ফলে ছোটখাটো শারীরিক সমস্যাও অনেক সময় গুরুতর আকার ধারণ করছে। চিকিৎসকদের মতে, কয়লার সূক্ষ্ম কণা ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত পানির সংস্পর্শে দীর্ঘদিন থাকলে ত্বক, ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই এসব শ্রমজীবী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার আওতায় আনা জরুরি।
এদিকে কয়লা উত্তোলন বন্ধ থাকলে তাদের আয়ও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তখন অনেক পরিবারকে ধারদেনা করে চলতে হয়। ফলে খনির কার্যক্রমের ওপরই নির্ভর করে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। সমাজকর্মীদের মতে, এটি শুধু দারিদ্র্যের গল্প নয়; বরং নিরাপদ কর্মসংস্থানের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িয়ে পড়া মানুষের বাস্তব চিত্র। তারা বলছেন, এসব নারীর জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা না গেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাদের এ কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন