সরাসরি সড়কের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দির। মন্দিরের সামনে একটা একচালা টিনের ছাউনি। ভক্তদের বসার জন্য তৈরি হলেও আজ তা হয়ে উঠেছে এক অস্থায়ী পাঠশালা। মরচে ধরা সেই ছাউনির নিচে, খোলা মাটিতে মাদুর পেতে বসে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা শিখছে অক্ষরজ্ঞান।
পাশে একটা পুরোনো চেয়ার, রং খসে পড়েছে বহু আগেই। সেখানেই বসে পড়ান বয়স আশির কাছাকাছি একজন বয়স্ক মানুষ, রমনি কান্ত দাস।
প্রতিদিন সকালেই তিনি এসে হাজির হন সেই স্কুলে। হাতে ছেঁড়া খাতা, চোখে ঘোলা চশমা, কাঁধে পুরোনো গামছা।
দাঁত পড়েছে প্রায় সবই, কথা বলার সময় উচ্চারণে টান পড়ে, হাঁটতেও কষ্ট হয়। তবু দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, তিনি আসেন, একটিবারের জন্যও নিয়ম ভাঙেননি।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের মানুষ রমনি কান্ত দাস। ১৯৬৮ সালে নিজের বাড়ির উঠোনেই শুরু করেছিলেন শিক্ষার এই যাত্রা।
তখন চারপাশে স্কুল ছিল না বললেই চলে। দূরের যেসব স্কুল ছিল, সেখানে যাওয়া যেত নৌকায়। ভয় আর দূরত্বে শিশুদের স্কুলে পাঠাতে চাইতেন না অনেকেই। সেই শূন্যতা থেকেই জন্ম নেয় ‘রমনি কান্তের পাঠশালা’। স্বাধীনতার পর কিছুদিন পাঠশালা বন্ধ থাকলেও, পরে মন্দিরের বারান্দায় নতুন করে শুরু হয় পাঠদান।
এখনো স্কুলের নেই কোনো ভবন, নেই সরকারি স্বীকৃতি। আছে শুধু মাটিতে পাতা মাদুর, আর একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক।
এই পাঠশালা থেকে হাতেখড়ি নিয়েছে শত শত মানুষ। আজও সকাল হলেই অভিভাবকেরা তাদের ছোট ছেলেমেয়েকে নিয়ে এসে হাজির হন এখানে। একদিন সকালে দেখা গেল, উর্মী বৈদ্য নামের এক গৃহবধূ তাঁর ছেলে অর্ককে নিয়ে এসে বসেছেন মাদুরে। পাশে বসে বললেন,
‘আমার স্বামী এই স্কুলেই পড়েছেন। এমনকি আমার শ্বশুরও। রমনি কান্ত স্যার আমাদের তিন প্রজন্মকে পড়িয়েছেন। আমরা গরিব মানুষ, মাসে মাসে টাকা দিতে পারি না। ভালো ফসল হলে চাল দিয়ে যাই, না হলে সেটুকুও পারি না।’
রমনি কান্ত বলেন, ‘তখন আশপাশে কোনও স্কুল ছিল না। কয়েকজন বাচ্চা বই নিয়ে আসত, আমি আমার উঠোনে বসে পড়াতাম। সেখান থেকেই শুরু।’ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি কেটে গেছে সেই দিনগুলোর। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন, চলাফেরা কষ্টের, চোখেও ভালো দেখেন না। কিন্তু ক্লাস নেয়া বন্ধ করেননি এখনো। রমনি কান্ত আরো বললেন, ‘এই মন্দিরের উঠোনেই আমার জীবন কেটেছে। না এলেই বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তবে ভাবছি, আগামী বছর হয়তো আর পারব না। শরীর আর সায় দিচ্ছে না।’
এই কথায় চুপসে যায় চারপাশের মানুষ। প্রাক্তন ছাত্র প্রলাদ বৈদ্য বলেন, ‘আমাদের গ্রামের কেউ সই করতে জানত না। রমনি কান্ত স্যারই প্রথম শেখালেন বর্ণমালা। আমরা আজ যা হয়েছি, তাঁর কারণেই।’
প্রতিদিন সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত গেয়ে শুরু হয় পাঠ। শিক্ষার্থীরা একে একে গিয়ে প্রণাম করে শিক্ষককে। তারপর লেখাপড়া দুপুর ১২টা পর্যন্ত লেখাপড়া চলে। শেষ হলে রমনি কান্ত ধীরে ধীরে বই-খাতা গুছিয়ে নেন। ছাপড়া ঘরের চারপাশে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। শুধু বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক নিঃস্ব অথচ নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকের জীবনের প্রতিধ্বনি; একজন মানুষ, যিনি নিজের কিছু না পেয়েও অনেককে আলো দিয়েছেন।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন