ট্রেনের বগিতে পুলিশের উপস্থিতি যাত্রীদের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক। বিপদের সময় পুলিশ পাশে থাকবে, সন্দেহজনক ব্যক্তির গতিবিধি নজরে রাখবে এবং অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিহত করবে—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় রেলওয়ে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ প্রতিরোধ, সন্দেহজনক ব্যক্তির ওপর নজরদারি কিংবা বিপদে পড়া যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে টিকিট ও পরিচয় যাচাইয়ের তৎপরতাই বেশি চোখে পড়ে। যদিও রেলওয়ে পুলিশ বলছে, টিকিট পরীক্ষা তাদের দায়িত্ব নয়। তাদের মূল দায়িত্ব যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ট্রেনে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা।
রেলওয়ে পুলিশের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে ২ হাজার ৮৪টি মামলায় ৩ হাজার ২১৭ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা ও গ্রেপ্তারের এই পরিসংখ্যান পুলিশের কার্যক্রমের একটি দিক তুলে ধরলেও অপরাধ সংঘটনের আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। সম্প্রতি ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ট্রেনের ক্যান্টিনকর্মী আবু বক্কর সিদ্দিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন।
রেলওয়ে পুলিশপ্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী যাত্রীকে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় পুলিশ তাকে খাবারের বগিতে নিয়ে যায় এবং নারী পুলিশ সদস্য দিয়ে তল্লাশি করা হয়। তবে তার কাছে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। ওই নারীর কাছে সাড়ে ১১ হাজার টাকা ছিল বলেও জানান তিনি। পরে পুলিশের দুই সদস্য তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন—এমন অভিযোগও ওঠে। ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।
এই ঘটনা সামনে এনে দিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—কোনো নারী যাত্রীকে সন্দেহের কারণে জিজ্ঞাসাবাদ বা তল্লাশির প্রয়োজন হলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে? বিশেষ করে নারী যাত্রীর ক্ষেত্রে নারী পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি, প্রকাশ্য স্থানে জিজ্ঞাসাবাদ এবং কোনো অপরিচিত ব্যক্তি বা কর্মচারীর সঙ্গে তাকে একান্তে না রাখার মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অপরদিকে ট্রেনে অপরাধের ধরনও বদলাচ্ছে। গত জুলাইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে যাত্রীবেশে ছিনতাইয়ের অভিযোগে ১১ নারীকে গ্রেপ্তার করে রেলওয়ে পুলিশ। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, শুধু টিকিট পরীক্ষা করলেই ট্রেনের ভেতরে অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব নয়। অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন নিয়মিত বগিতে টহল, সন্দেহজনক আচরণ পর্যবেক্ষণ, যাত্রীদের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ। বিশেষ করে নারী, শিশু, একা ভ্রমণকারী এবং অসুস্থ বা অসহায় যাত্রীদের নিরাপত্তায় বাড়তি নজর দেওয়া জরুরি।
রেলওয়ে পুলিশপ্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, জনবল সংকটের কারণে সব ট্রেনে পুলিশ মোতায়েন করা সম্ভব হয় না। একটি পুরো ট্রেনে অনেক সময় মাত্র তিনজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আরও বলেন, যাত্রীদের টিকিট তল্লাশি পুলিশের দায়িত্ব নয়; সন্দেহভাজন ব্যক্তির তল্লাশি ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোই পুলিশ দেখে।
তবে একটি দীর্ঘ ট্রেনে মাত্র কয়েকজন পুলিশ সদস্য দিয়ে যাত্রীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। পুলিশের উপস্থিতি যদি পুরো ট্রেনে সমানভাবে দৃশ্যমান না থাকে, তাহলে অপরাধ প্রতিরোধে নজরদারি কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও ভাবতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটনের পর মামলা করা বা আসামি গ্রেপ্তার করা নয়। অপরাধ সংঘটনের আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিহত করা এবং যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করাও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের ঘটনাটি তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোনো যাত্রীর টিকিট, পরিচয় বা আচরণ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে তাকে যাচাই করার পর তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরবর্তী ধাপ কী? রেলপথ মন্ত্রণালয় নারী ও শিশুসহ সব যাত্রীর নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। তবে শুধু উদ্যোগ ঘোষণা করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।
একজন যাত্রীর টিকিট বৈধ কি না, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—ট্রেনে ওঠার পর তিনি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন কি না। রেলওয়ে পুলিশের সামনে তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু কে টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠেছে তা শনাক্ত করা নয়; বরং কোনো যাত্রীর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আগেই সেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন