ফেনীর সোনাগাজীর নবাবপুর ইউনিয়নের পূর্ব সুলতানপুর বন্দর মার্কেট এলাকায় কালিদাস পাহালিয়া নদীর নবাবপুর সেতুর তলদেশ থেকে নদী ভাঙন রোধে বালু ভরাটের কথা বলে বাণিজ্যিকভাবে ১৫ দিন ধরে বালু তোলা হচ্ছে। এতে হুমকিতে পড়েছে নবাবপুর সেতু ও তার তলদেশ এবং আশেপাশের সড়ক।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল সৃষ্টি হয়। এসময় উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন।
অভিযোগ রয়েছে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন প্রকল্পের আওতায় ড্রেজিং ও বালু উত্তোলনে অনিয়ম করে আশেপাশের বিভিন্ন ব্যক্তির জমি, পুকুর, জলাশয় ভরাট করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন সদর উপজেলার ফরহাদনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বাচ্চু ও সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা জহিরুল আলম জহির।
এ বিষয়ে ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে নবাবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন ভূঁইয়া জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (মানবসম্পদ ও উন্নয়ন) রোমেন শর্মা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মনজুর আহসান ও সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগ্যান চাকমা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
এসময় তাদের উপস্থিতিতে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সমর্থিত বিএনপি নেতাকর্মী ও অভিযোগকারীদের পক্ষের বিএনপি নেতাকর্মীরা একে অপরের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এসময় তারা চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেন এবং ঠিকাদারি বাদ দিয়ে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নবাবপুর সেতু সংলগ্ন এলাকায় সেতুর তলদেশের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। নদী ভাঙনের ফলে আশেপাশের রাস্তা বিলীন হয়ে গেছে। এ ভাঙন রোধে বাঁকা নদী সোজাকরণের লক্ষ্যে নদীর পাশে চর কেটে গতিপথ পরিবর্তন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ লক্ষ্যে বালু উত্তোলন করা হলেও অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের অভিযোগে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেন।এছাড়াও উত্তোলিত বালু দিয়ে আশেপাশের বিভিন্ন বাড়িঘর, পুকুর ও জমি ভরাট করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এসব জমি ও পুকুর টাকার বিনিময়ে ভরাট করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সালাউদ্দিনের বাড়ির পুকুর ভরাট করা হয়েছে ১০ লাখ ৪৭ হাজার টাকার বিনিময়ে। শিরিন আক্তারের পিতার ২৫০ শতক জমি বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। মো. এমরান হোসেন প্রকাশ রোমের পুকুর ভরাট করা হয়েছে। এছাড়াও ৩০ শতকের ১৫ ফুট গভীর পুকুর ভরাট এবং প্রায় ৮০ শতক জমি ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে বালু মহাল।
স্থানীয় ভুক্তভোগী আব্দুল হাই বলেন, আমার ২১ ডিসিম জায়গা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমি এটার প্রতিকার চাই। আমাদের জিজ্ঞাসা করেনি, কিছুই বলেনি। না বলেই জায়গা ভরাট করে ফেলেছে। যেখান থেকে বালু নেওয়ার কথা সেখান থেকে কাটছে না। আমার মতো আরও অনেকের জমি নষ্ট হচ্ছে।
অভিযোগকারী জহির উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, আমি ইউনিয়নের সর্বসাধারণের পক্ষে অভিযোগ করেছি। বালু উত্তোলনে সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী বাঁকাকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে, চর কাটার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু ফরহাদনগরের সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চু ও নবাবপুরের চেয়ারম্যান জহিরের যৌথ তত্ত্বাবধানে নদীর মাঝখান থেকে বালু উত্তোলন করে টাকার বিনিময়ে আশেপাশের জমি-পুকুর ভরাট করছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নবাবপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জহিরুল হক জহির। তিনি বলেন, সরকার ৩৪ হাজার ঘনফুট ড্রেজিংয়ের অনুমতি দিয়েছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এ জায়গাটি সরেজমিনে দেখে নদী ভাঙন রোধের জন্য বালু উত্তোলনের নির্দেশনা দিয়েছেন। অবৈধভাবে কোনো বালু উত্তোলন করা হয়নি।
তিনি বলেন, আমাদের আরও জায়গা প্রয়োজন কারণ আরও অন্তত ২৫ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হবে। আমরা পাইপ দিয়ে বালু নিয়ে যাচ্ছি। বালু মহালের আশেপাশে পানির স্রোতের কারণে অন্যান্য জায়গা ভরাট হচ্ছে। এ জায়গাগুলো ভাড়া নেওয়া হয়েছে। আমি শুধু তদারকি করছি, আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।
অন্যদিকে অভিযুক্ত ফরহাদনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বাচ্চু বলেন, এখানে আমার কোনো স্বার্থ নেই। উত্তোলনের কাজে যে নৌকা ও সরঞ্জাম ব্যবহার হচ্ছে সেগুলো আমি ভাড়া দিয়েছি এবং তদারকি করছি।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (মানবসম্পদ ও উন্নয়ন) রোমেন শর্মা বলেন, আমরা অভিযোগ পেয়েছি বালু উত্তোলন করে অন্য জায়গায় বিক্রি করা হচ্ছে। এজন্য সরেজমিনে গিয়েছি। পরবর্তীতে আরও বিশেষজ্ঞরা আসবেন। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে জেলা প্রশাসককে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
এখানে নদী ভাঙন রোধে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য চর কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এখানে অন্য কোনো স্বার্থ আছে কিনা, সরকারি টাকায় কেউ লাভবান হচ্ছে কিনা এবং যারা অভিযোগ করেছে তাদের স্বার্থ আছে কিনা সেটিও দেখা হবে। যদি কোনো অনিয়ম পাই, বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন