গুলশানের একটি বারে অভিযান চালিয়ে কাগজপত্রবিহীন ২৩০ পিস লিকার জব্দের ঘটনায় আলোচনায় এসেছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। তবে রাজস্ব কর্মকর্তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা পরিচয়কে লক্ষ্য করে নয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই ঢাকার চারটি বার ও রেস্টুরেন্টে এই অভিযান চালানো হয়েছে। শনিবার ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান শেষে রাতে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রিজভী আহমেদ।
তিনি জানান, শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে লিকারজাতীয় পণ্য মজুত ও ব্যবসা করার অভিযোগ ঠেকাতে এই অভিযান শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে চারটি পৃথক দল ঢাকার বিভিন্ন বার ও রেস্টুরেন্টে অভিযান চালায়। অভিযানের প্রথম দল গুলশানের ফু ওয়াং বোওলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডে যায়। প্রতিষ্ঠানটি সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের মালিকানাধীন বলে জানানো হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২৩০ পিস লিকার পাওয়া যায়। এসব পণ্যের বৈধ কাগজপত্র চাওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি তা দেখাতে পারেনি।
কর্মকর্তারা জানান, পণ্যগুলো একটি কাভার্ডভ্যানে করে প্রতিষ্ঠান থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরে সেগুলো আটক করা হয়। এছাড়া ওই প্রতিষ্ঠানে ‘জিনশেং’ নামে একটি পণ্য পাওয়া যায়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শর্তযুক্ত আমদানি পণ্য এবং এ ধরনের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন। কিন্তু এ পণ্যের ক্ষেত্রেও কোনো বৈধ নথি দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। অভিযানে প্রায় এক কেজি জাফরানও পাওয়া যায়। কর্মকর্তারা জানান, উচ্চ শুল্কের কারণে এটি মূল্যবান আমদানি পণ্য। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি ও বিক্রিসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি যাচাই-বাছাইয়ের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই অভিযানের অংশ হিসেবে গুলশানের মার্গারিটা লাউঞ্জেও অভিযান চালানো হয়। সেখানে মোট ৬০৮ লিটার অনুমোদিত মদ পাওয়া যায়। এর মধ্যে মাত্র ৩৬ লিটার দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য ছিল। অভিযান শেষে পুরো মদই জব্দ করা হয়েছে। তেজগাঁওয়ের হোটেল হলিডে ইন ইন্টারন্যাশনালেও অভিযান চালায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের দল। সেখানে কর্মকর্তারা দেখতে পান, হোটেলটির বার হোটেলের নিজস্ব নামে লাইসেন্স করা নয়। বরং এটি ‘হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল’-এর নামে পরিচালিত হচ্ছে।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেননি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। বর্তমানে তাদের কাগজপত্র সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।এদিকে তেজগাঁওয়ের আরএডাব্লিউ ক্যানভাস রেস্টুরেন্ট থেকেও ২৯ লিটার অননুমোদিত লিকার জব্দ করা হয়েছে।
তবে সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আক্রোশ থেকে করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী আহমেদ বলেন, রাজস্ব বোর্ডের অভিযানে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন মুখ্য বিষয় নয়। তার বক্তব্য, রাজস্ব কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা নথিপত্র এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করেই সম্ভাব্য অনিয়মের জায়গাগুলোতে অভিযান চালানো হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই অভিযানের লক্ষ্য নয় বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
এনবিআর জানিয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকার কয়েকটি বার, রেস্টুরেন্ট, কূটনৈতিক বন্ডেড গুদাম ও শুল্কমুক্ত দোকানে অবৈধ উৎস থেকে অ্যালকোহল বা অ্যালকোহলজাত পণ্য সংগ্রহের অভিযোগ পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রযোজ্য শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর ফাঁকি এবং অননুমোদিত গ্রাহকদের কাছে এসব পণ্য সরবরাহের অভিযোগও ছিল। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই সমন্বিত অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অভিযানের জন্য কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর চারটি দল গঠন করে। এসব দলের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল, মূল্য সংযোজন কর নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কর্মকর্তারাও অংশ নেন। এখন জব্দ করা পণ্য, আমদানি-বিক্রির নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স ও অনুমোদন যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে অনিয়ম বা শুল্ক-কর ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন