হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে মাত্র সাত দিনের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল আবারও শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান তিনি।
আব্বাস আরাগচি বলেন, প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা সম্ভব। নতুন প্রস্তাবে যেসব শর্ত রাখা হয়েছে, সেগুলো গত জুনে হওয়া ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকেই ছিল। অর্থাৎ নতুন করে বড় কোনো শর্ত যোগ করা হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া যেতে পারে। এরপর সাত দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রস্তাবটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটি পুরোপুরি ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠিক কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি আব্বাস আরাগচি। তিনি শুধু বলেন, মার্কিনিদের দেওয়া শর্তগুলো ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকেই উল্লেখ রয়েছে এবং এতে নতুন কিছু নেই। এদিকে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের নতুন প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। এসব আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যুও রয়েছে।
গত ১৮ জুন করা ১৪ দফার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এতে বলা হয়েছিল, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হবে না। পাশাপাশি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও ছিল। এ ছাড়া ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ও সমঝোতায় রাখা হয়েছিল। এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল ইরানের। ভবিষ্যতে এই নৌপথে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু সমঝোতার কয়েক দিনের মধ্যেই দুই দেশ আবার হামলা ও পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়ায় সেটি কার্যত ভেস্তে যায়। এখন আবারও সেই সমঝোতার শর্ত সামনে এনে হরমুজ প্রণালি খোলার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে এই প্রস্তাব কতটা ভূমিকা রাখবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ হরমুজ প্রণালি শুধু সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্র নয়, এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরি হয়। ইরানের দাবি, অনুমোদনহীন রুট ব্যবহার করে হরমুজ দিয়ে চলাচলের কারণে কয়েকটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজের আশপাশে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানোর পাশাপাশি কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও চাপ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে যুদ্ধের অবসান, জ্বালানির দাম এবং চলমান অস্থিরতা—সবকিছু মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ইরানের সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক করার প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত শেষ করার পথে আদৌ নতুন কোনো সমঝোতা তৈরি হয় কি না।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন