একসঙ্গে ডেঙ্গু, হাম, টাইফয়েড, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চিকুনগুনিয়াসহ নানা রোগের প্রকোপ—রাজধানীতে এখন ঘরে ঘরে জ্বরের আতঙ্ক। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে সাধারণ জ্বর হলেও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ডেঙ্গু ও হামের ভয়। উত্তরা থেকে মতিঝিলে নিয়মিত মেট্রোরেলে যাতায়াত করেন তামনিয়া ইসলাম। সম্প্রতি মেয়েকে নিয়ে মেট্রোরেলে যাতায়াতের পর তিনি ও তার সন্তান জ্বরে আক্রান্ত হন। পরে তার ছোট মেয়েরও জ্বর শুরু হয়। সন্তানদের ডেঙ্গু বা হাম হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সাধারণত মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর সময়ে বিভিন্ন ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। এবারও একই সময়ে হাম, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড, মামসসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু ও ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বরের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে গণপরিবহন, স্কুল-কলেজ ও জনসমাগমের জায়গাগুলোতে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়াচ্ছে বিভিন্ন ভাইরাস। এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপরও।
রোববার সকালে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে দেখা যায়, শিশুদের নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অভিভাবকেরা। কারও নাক দিয়ে পানি পড়ছে, কারও কাশি ও শ্বাসকষ্ট, আবার কেউ জ্বরে নিস্তেজ হয়ে আছে। সকাল থেকেই একাধিক কাউন্টারে চিকিৎসকেরা রোগী দেখছিলেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিত, এখন সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।
শিশুদের মধ্যে শুধু ডেঙ্গুই নয়, হাম ও মামসের মতো রোগও বাড়ছে। পাঁচ বছরের এক শিশুর দুই দিন ধরে জ্বর ও গলা ফুলে যাওয়ায় পরিবারের ধারণা ছিল টনসিলের সমস্যা হয়েছে। পরে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে মামসের আশঙ্কা করেন। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা, সাধারণ সর্দি, টাইফয়েড ও প্যারাটাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগী এলেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নিতে পারলেও শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী কিংবা যাদের ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, লিভার বা কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। একইভাবে বমি, রক্তক্ষরণ বা খাবার গ্রহণে অক্ষমতার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে মৌসুমি জ্বর, ফ্লু, হাম, ডেঙ্গু, টাইফয়েড, ভাইরাসজনিত জন্ডিস, মামস, টনসিলের প্রদাহ, চোখের সংক্রমণ ও চিকুনগুনিয়াও দেখা যাচ্ছে। তবে হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
তিনি বলেন, জ্বরের সঙ্গে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। শিশুকে পর্যাপ্ত তরল খাবার দিতে হবে, বুকের দুধ চালিয়ে যেতে হবে এবং জ্বর কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দিতে হবে। নিজের সিদ্ধান্তে অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। এদিকে ডেঙ্গুর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি মাসের ১৩ দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৫২ জন। আর গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে আরও ছয়জনের। এতে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৯ জনে।
একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫১৬ জন। ফলে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৮৩৭ জন। এর মধ্যে ৪৮ হাজার ৯৩ জন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। শুধু ডেঙ্গু নয়, হামের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গে শনাক্ত হয়েছে ৯০৫ জন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৪৩ জন।
এই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ৬৯ জন। আর হামের উপসর্গে মোট ৯২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ১০০ শিশুর। সব মিলিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে জ্বরের প্রকোপ এখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা না করে বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গের দিকে নজর রাখা, পর্যাপ্ত তরল দেওয়া এবং গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন