শ্রাবণের স্নিগ্ধ এক সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে জমে ওঠে ব্যতিক্রমী এক সাংস্কৃতিক আয়োজন। বাইরে বৃষ্টিভেজা আবহ, আর ভেতরে সুর, কবিতা, নাটক ও নৃত্যের মেলবন্ধনে দর্শকদের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠেন বাংলা গানের কিংবদন্তি কবি, নাট্যকার ও সুরকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তাঁর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সাংস্কৃতিক সংগঠন ভৈরবী মঞ্চস্থ করে বিশেষ গীতিনকশা ‘সুরের দয়াল রায়’। প্রযোজনাটির রচনা ও নির্দেশনা দেন ইলিয়াস নবী ফয়সাল। প্রায় অর্ধশত শিল্পীর অংশগ্রহণে নির্মিত এই পরিবেশনায় সংগীত, অভিনয়, আবৃত্তি ও নৃত্যের সমন্বয়ে তুলে ধরা হয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জীবন, সাহিত্যকর্ম এবং মানবিক দর্শনের নানা দিক।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় তাঁর জনপ্রিয় গান ‘আজি নূতন রতনে ভূষণে যতনে প্রকৃতি সতীরে সাজিয়ে দাও’ পরিবেশনের মাধ্যমে। এরপর একে একে দর্শকদের সামনে উঠে আসে তাঁর শৈশব, সাহিত্যজীবন, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান, সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং কৃষকের জীবনের প্রতি তাঁর আন্তরিক মমত্ববোধ। আয়োজকরা জানান, এই প্রযোজনায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে শুধু একজন গীতিকার বা নাট্যকার হিসেবে নয়, বরং মানুষের শিল্পী হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণেই মানুষ তাঁকে স্নেহভরে ‘দয়াল রায়’ নামে ডাকত—সেই গল্পও স্থান পেয়েছে মঞ্চায়নে।
এক ঘণ্টার পরিবেশনায় দর্শকদের জন্য পরিবেশিত হয় তাঁর বহু কালজয়ী সৃষ্টি। দেশপ্রেম, প্রকৃতি, প্রেম, মানবিকতা ও ভক্তির নানা অনুভূতি ছড়িয়ে থাকা গানগুলো নতুন আবহে মুগ্ধ করে উপস্থিত দর্শকদের। আয়োজনের শেষ হয় তাঁর আরেক জনপ্রিয় গান ‘আমরা মলয় বাতাসে’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। নির্দেশক ইলিয়াস নবী ফয়সাল বলেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান ও নাট্যভাবনা বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর দেশপ্রেম, মানবিকতা ও শিল্পচিন্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই আয়োজন।
১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। বাংলা গানের আধুনিক ধারার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তিনি প্রায় পাঁচশত গান রচনা করেন। একসময় তাঁর গান ‘দ্বিজুবাবুর গান’ নামে পরিচিত থাকলেও পরবর্তীতে তা ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’ নামে স্বীকৃতি লাভ করে। দেশপ্রেম, প্রকৃতি, ভক্তি, হাস্যরস ও মানবিক আবেগে ভরপুর তাঁর সৃষ্টিগুলো আজও বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে সমান জনপ্রিয়। আয়োজক প্রতিষ্ঠান ভৈরবী দীর্ঘদিন ধরে সংগীত, নাটক, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক গবেষণার মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। শ্রাবণের এই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার আয়োজনও সেই প্রচেষ্টারই আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন