দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৫৮ দিনে হামে ও উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৪১৫ শিশু। একই সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৯৮০ শিশুকে। চাঁদপুরের শিশু তাজিমের মৃত্যু এবং সন্তান হারানো ফারজানা-হেলাল দম্পতির কান্না দেশজুড়ে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে মহামারি পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই ইতোমধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা সংকট, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, পুষ্টিহীনতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে সংকট আরও ভয়াবহ হয়েছে। তার মতে, দায় নির্ধারণে স্বচ্ছ তদন্ত এবং শ্বেতপত্র প্রকাশ জরুরি। তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সীমান্তের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর মার্চ নাগাদ কেন্দ্রীয় টিকা গুদামে হামের টিকার মজুত শূন্য হয়ে যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, টিকা কর্মসূচিতে কর্মী সংকট, মাঠপর্যায়ের কর্মবিরতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। এর পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা ও বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন ও কৃমিনাশক কর্মসূচি যথাযথভাবে না চলায় শিশুরা আরও ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। সরকার ইতোমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে নতুন টিকা সরবরাহ শুরু করেছে এবং বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এখনও উদ্বেগজনক।
জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি জনস্বাস্থ্য ঘোষণা, হাসপাতালের আইসিইউ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন