ময়মনসিংহের ভালুকায় কারখানা শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসের বাবা অভিযোগ করে বলেছেন, ‘আমার ছেলে ষড়যন্ত্রের শিকার। কারখানার কেউ হয়তো ষড়যন্ত্র করে প্রতিশোধ নিয়েছে।’ গতকাল শুক্রবার নিহত দিপুর তারাকান্দার গ্রামের বাড়িতে গেলে তার বাবা এই অভিযোগ করেন।
জানা গেছে, দিপুর বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলা সদরে।
তিনি উপজেলার রবি চন্দ্র দাসের ছেলে দিপু চন্দ্র দাস। তিনি ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়ায় অবস্থিত পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড নামের পোশাক কারখানায় লিংকিং সেকশনে কাজ করে আসছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজন ও কারখানার কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন দিপুকে কারখানা থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে আসে। ওই সময় গণপিটুনিতে দিপু মারা যান। পরে বিক্ষুব্ধরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রোড ডিভাইডারের একটি গাছে দিপুর মরদেহ ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পরে, গতকাল সকালে নিহত দিপুর তারাকান্দার গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
কান্নায় ভেঙে পড়ছেন আর মূর্ছা যাচ্ছেন নিহতের স্বজনরা। নিহত দিপুর বাবা রবিদাস বলেন, ‘আমরা দরিদ্র মানুষ। খেয়ে-না খেয়ে ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করছি। তিন ছেলের মধ্যে দিপু ছিল সবার বড় ও একমাত্র উপার্জনকারী। টাকার অভাবে বিএ পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে না পারায় গার্মেন্টস শ্রমিকের চাকরি নেয় সে।
গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে ছুটির পর বাড়িতে আসে। পরের দিন ভোরে চলে যায় কারখানায়।’ তিনি বলেন, ‘কারখানার কেউ হয়তো ষড়যন্ত্র করে প্রতিশোধ নিয়েছে।’
দিপুর মা শেফালী রানী দাস বলেন, ‘ছেলের উচ্চরক্তচাপ ছিল। নিজের জন্য চিকিৎসা না করে বাড়িতে টাকা পাঠাত।’
দিপুর বোন চম্পা দাস জানান, ধর্ম নিয়ে তার ভাই এমন কথা বলার মানুষ ছিল না। কারখানায় ঝামেলা ছিল। তাই হয়তো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দাদাকে মেরে ফেলা হয়েছে। পুলিশের হাতে তুলে দিলে ভাইয়ের এমন মৃত্যু হতো না।
নিহতের স্ত্রী মেঘনা রানী জানান, তাদের একটি ছেলে আছে। অভাবের সংসার। এখন তারা কোথায় দাঁড়াবেন বলে প্রশ্ন করেন তিনি।
তারাকান্দা থানার ওসি তানভীর আহাম্মেদ বলেন, নিহত যুবকের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের প্রতিটি সদস্যকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
ভালুকা মডেল থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় গতকাল বিকেলে ভালুকা থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন নিহতের ভাই অপু দাস। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে কারখানার গেটে গিয়ে দেখা করতে চাইলেও অনুমতি মেলেনি। তবে কম্পানির সিকিউরিটি গার্ড ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘দিপুকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। কিন্তু তিনি ক্ষমা চাননি। এ কারণে কম্পানির ভেতরে ও বাইরে তা জানাজানি হলে লোকজন গেটের সামনে এসে জড়ো হয়ে ভাঙচুর চালায়। পরে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাকে জনতার হাতে তুলে দেয়।’
ভালুকা মডেল থানার ওসি জাহেদুল ইসলাম বলেন, শত শত মানুষের মধ্যে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। পরে পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।
এদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল এক বিবৃতিতে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই বাংলাদেশের প্রচলিত আইন দ্বারা সমর্থিত নয়। ইসলাম কখনোই বিচারবহির্ভূত হত্যা, গণপিটুনি কিংবা সহিংসতার অনুমোদন দেয় না। অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমেই হতে হবে—এটাই আইনের শাসনের মৌলিক নীতি।’
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন