ফ্রান্সে টানা তৃতীয় সপ্তাহেও থামছে না তরুণ ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা এবং সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা থেকে রাজপথে নেমেছেন লাখ লাখ মানুষ। শান্তিপূর্ণ মিছিল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ২৯০ জনকে।
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই বিক্ষোভ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, আন্দোলনে অংশ নেন প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসেই ছিলেন ৭০ হাজার। তবে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্বকারী জোটের দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। শুধু প্যারিসেই অংশ নেন দুই লাখ মানুষ। প্যারিস ও লিয়ন শহরে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্যারিসে মিছিলের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে ময়লার পাত্র ও রাস্তার আসবাবপত্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যাপকভাবে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এতে আশপাশের এলাকায় শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্দোলনকারীদের বড় একটি অংশ সহিংসতার বিরোধিতা করলেও সরকারের ওপর তাদের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হলেও সরকার তাদের কথা শুনছে না। ফলে সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন মুখোশধারী কয়েক ডজন ব্যক্তি হাতুড়ি দিয়ে রাস্তার পাথর তুলে পুলিশের দিকে ছুড়তে শুরু করেন। এমনকি দাহ্য পদার্থও নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা পুলিশ বারবার সতর্কবার্তা দেয়। আহতদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীরাও ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
বিক্ষোভ মোকাবিলায় ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ২৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হ্যালোইনের রাতকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে ব্যয় সংকোচনের বিভিন্ন উপায় খুঁজছেন। তবে আন্দোলনকারীদের অসন্তোষ কমাতে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এর আগে গত মাসে জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক সংকট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার নানা সমস্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরাও। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। সেই আন্দোলনও একপর্যায়ে ব্যাপক সংঘর্ষে রূপ নিয়েছিল। এদিকে ফ্রান্সের এই আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও। জার্মানির কোলনসহ ৩০টির বেশি শহরে মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষাক্ষেত্রে ছাঁটাই এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে স্পেনের বার্সেলোনায় সংঘর্ষের পর ১৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইতালির মিলান, তুরিন ও বোলোনিয়াতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে কেন্দ্র করে ইউরোপজুড়ে বাড়ছে জনঅসন্তোষ। তবে ফ্রান্সের রাজপথে চলমান এই আন্দোলন আরও কত দূর গড়ায়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
সূত্র: আল জাজিরা।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন