বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ‘সোনালি আঁশ’ পাটশিল্প হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার পথে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ও রুগ্ণ হয়ে থাকা বেশ কয়েকটি বেসরকারি পাটকল আবারও উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপ। নতুন কারখানা নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েই শিল্প পুনরুজ্জীবনের এই কৌশল নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
একসময় দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল পাট। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতের একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ শিল্পে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। আদমজীর পর বাওয়ানী, আমিন জুট মিলসহ সরকারি খাতের বেশ কয়েকটি বড় পাটকল বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে বিভিন্ন প্রতিকূলতায় বেসরকারি খাতের অনেক কারখানাও উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এতে পাটের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থান হারান বহু শ্রমিক। এই পরিস্থিতিতে বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পকারখানাগুলোকে আবার উৎপাদনের আওতায় আনার উদ্যোগের অংশ হিসেবে আবুল খায়ের গ্রুপ বেসরকারি খাতের বন্ধ পাটকল পুনরায় সচল করার কার্যক্রম শুরু করেছে।
ইতোমধ্যে ফরিদপুরের রাজ্জাক জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, ফরিদপুর জুট মিল ও দামাশি জুট মিল, খুলনার আহিয়ান জুট মিল, কুষ্টিয়ার নাসির জুট মিল এবং মাগুরার এ আর জুট মিলে আবারও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত পাটের সুতা ইতোমধ্যে তুরস্ক, চীনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হচ্ছে। আবুল খায়ের গ্রুপ এসব কারখানা থেকে বছরে প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন পাটের সুতা ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রপ্তানি আয় অর্জনের লক্ষ্যে কাজ চলছে।
এই উদ্যোগের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি সরকারি খাতের আরও তিন থেকে চারটি বন্ধ পাটকল পুনরায় চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে আবুল খায়ের গ্রুপ। আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট বিষয়ক ও আইন বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, পাটজাত পণ্যের ব্যবসা মূলধননির্ভর। দেশে অনেক বেসরকারি পাটকল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। তাই নতুন কারখানা স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান কারখানার অবকাঠামো ও সক্ষমতা কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বন্ধ শিল্প আবার উৎপাদনে ফিরছে এবং একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পাটের গুণগত মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পাট ও পাটজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে উচ্চমূল্যের পাটজাত পণ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর কথা জানান তিনি। শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, বন্ধ পাটকল পুনরুজ্জীবনের এই উদ্যোগ শুধু কারখানা চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর পাশাপাশি দেশের পাটচাষিদের জন্য একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
ফলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের পাটশিল্পে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। বন্ধ কারখানাগুলো সচল হলে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, পাটচাষিদের বাজার এবং বৈদেশিক বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশকে আবারও বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের পথেই এগোচ্ছে আবুল খায়ের গ্রুপ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন