মাত্র ১৩ বছরের একটি শিশুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এবার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতি। মামলার আসামিদের পক্ষে সমিতির কোনো আইনজীবী আইনি লড়াই করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী নেতারা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষকের সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রশাসন ও কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির যৌথ মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসেন সরকার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. বেলাল উদ্দিন, আইনজীবী নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অপ্রতিম হত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিষয়ে বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. সহিদ উল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাবুবুল হক খন্দকার সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
অ্যাডভোকেট সহিদ উল্লাহ জানান, মানবিক দিক বিবেচনায় জেলা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য এই হত্যাকাণ্ডের আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই করবেন না বলে মৌখিকভাবে একমত হয়েছেন। তবে আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকলে বিচারপ্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হবে কি না—এমন প্রশ্নও উঠেছে। আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং একতরফা বিচার এড়াতে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্র আসামিদের জন্য সরকারি আইনজীবী নিয়োগ করতে পারে।
এদিকে মতবিনিময় সভা শেষে আইনজীবী সমিতির নেতারা কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকায় অপ্রতিমের ভাড়া বাসায় গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন। তারা শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আইনি সহায়তার আশ্বাস দেন। নিহত অপ্রতিমের মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম অভিযোগ করেন, সন্তানকে হারানোর পরও ঘাতকদের সহযোগীরা তাদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি দ্রুত হত্যার বিচার দাবি করেন।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের মধ্যে রয়েছেন ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিন, ১৯ বছর বয়সী মো. সিয়াম এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে সিয়াম ছাড়া বাকি তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
ঘটনার শুরু গত শুক্রবার। দুপুরে মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাই পাহাড়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গল থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মাত্র ১৩ বছরের শিশুর এমন নির্মম মৃত্যুতে কুমিল্লাজুড়ে শোক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এখন পরিবারের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক। আর সেই দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির এই সিদ্ধান্ত মামলাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তদন্ত, আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন