একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে প্রতিদিনই বাড়ছে সংসারের খরচ। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় যেন নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। পরিবহন ভাড়া থেকে শুরু করে নিত্যপণ্য, কৃষি, শিল্প—প্রায় সব খাতেই বাড়তি খরচের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তার সঙ্গে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস সংকট, চিকিৎসা ও শিক্ষার বাড়তি ব্যয় মিলিয়ে অনেক পরিবারই এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন খাতেও। তেলের দাম বাড়ার পরপরই গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর দাবি উঠেছে। কোথাও কোথাও সরকারি অনুমোদনের আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
রাজধানীর ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ রুটে চলাচলকারী একটি বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে উত্তরা রুটের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে কয়েকটি গন্তব্যে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সরাসরি নির্ধারিত কাঠামো নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে। বিশেষ করে গ্যাস সংকটে থাকা বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অনেক কারখানা উৎপাদন চালু রাখতে সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে করে গ্যাস নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এতে একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
গ্যাস ও অন্যান্য সংকটে ছোট ছোট উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ কমার পাশাপাশি বেকারত্বের চাপ বাড়ছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ কম থাকায় কর্মসংস্থানের বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে কৃষিতে। ডিজেলচালিত সেচ পাম্প, কৃষিযন্ত্র ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এরই মধ্যে রাজধানীর খুচরা বাজারে কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে প্রায় সাত টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বেশ কিছু সবজি ৮০ টাকার ওপরে এবং কিছু পণ্য ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি ভোজ্য তেল সরবরাহ নিয়েও সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে পড়বে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে, উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চিকিৎসা ও শিক্ষার বাড়তি ব্যয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ে। অনেক পরিবারকে চিকিৎসার জন্য ঋণ নিতে হয়, এমনকি জমিজমা বিক্রির মতো সিদ্ধান্তও নিতে হয়। শিক্ষার ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের ওপর চাপ বাড়ছে। স্কুলের বেতন, কোচিং, প্রাইভেট পড়ানো ও বইসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে বাসাভাড়া, যাতায়াত ও দৈনন্দিন অন্যান্য খরচ বাড়লেও অনেক বেসরকারি চাকরিজীবীর আয় একই হারে বাড়ছে না। ফলে কেউ সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ আবার ধারদেনার ওপর নির্ভর করছেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বাড়তি অর্থ যোগ হওয়ার প্রভাবও বাজারে পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন। তবে একই সময়ে জ্বালানি, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও আবাসন—সব খাতের ব্যয় বাড়তে থাকলে আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান সাধারণ মানুষের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাড়তি খরচের এই চাপ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে? কারণ তেলের দাম থেকে পরিবহন, পরিবহন থেকে পণ্য, আর পণ্যের দাম থেকে পুরো সংসারের বাজেট—প্রভাবের এই চক্রে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন সীমিত আয়ের মানুষ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন