জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একসময় ছোট একটি কোণার কক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের আয়োজন। অথচ এবার সেই আয়োজন পেয়েছে বড় পরিসরের মূলধারার জায়গা। বিষয়টিকে রসিকতার ছলে নিজেদের ‘বিরাট পদোন্নতি’ হিসেবে তুলে ধরলেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী দিনে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের মন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই পুরোনো দিনের স্মৃতি তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, আগে এ ধরনের আয়োজনের জন্য জাতিসংঘের একটি ছোট কোণার কক্ষ পাওয়া যেত। জায়গা এতটাই সীমিত ছিল যে সেখানে উপস্থিত সবাইকে ঠিকমতো বসানোও কঠিন হয়ে পড়ত। তবে এবার পরিস্থিতি বদলেছে। বড় পরিসরের কক্ষে বিশ্বনেতা ও অতিথিদের উপস্থিতি দেখে রসিকতার সুরে ড. ইউনূস বলেন, এটি তাদের জন্য যেন একটি বড় পদোন্নতি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আবার সেই কোণার ঘরে ফিরতে হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণকেও স্বাগত জানান অধ্যাপক ইউনূস। সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর সময় তাকে পুরো আয়োজনজুড়ে পাওয়া বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আন্তর্জাতিক কূটনীতির নানা জটিল বক্তব্যের বিপরীতে সাধারণ মানুষের কাছে শান্তি ও ন্যায্যতার স্পষ্ট বার্তা পৌঁছানো প্রয়োজন বলেও নিজের প্রত্যাশা তুলে ধরেন ড. ইউনূস।
এরপর তিনি কথা বলেন ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তি এবং সামাজিক ব্যবসার বিস্তার নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ‘গ্রামীণ আমেরিকা’র কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে জানান, নিউইয়র্কসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পৌঁছেছে। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের হারও প্রায় শতভাগ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার আওতায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদাহরণও তুলে ধরেন ড. ইউনূস। এর মধ্যে রয়েছে ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, টেলিমেডিসিন নেটওয়ার্ক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্ষু হাসপাতাল। এসব প্রতিষ্ঠানের লাভ পুনরায় বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করেছে, সেই মডেলও তুলে ধরেন তিনি। সবশেষে তরুণদের জন্য নতুন একটি উদ্যোগের ঘোষণা দেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি জানান, আগামী ডিসেম্বর থেকে যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’র।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মতো শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরির পরিবর্তে এই প্রতিষ্ঠান তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেবে। এর মূল লক্ষ্য হবে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণের ধারণাকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করা। বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে সামাজিক ব্যবসা, তরুণ শক্তি ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর এই উদ্যোগে বিশ্বনেতাদের সহযোগিতাও কামনা করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন