নেপালের পাহাড়ে হঠাৎ হিমবাহ ধস, এরপর ভয়াবহ বন্যা—কিন্তু ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল এই বিপর্যয়? শুধু ভারী বৃষ্টিপাত, নাকি এর পেছনে ছিল হিমবাহ, ভূতত্ত্ব ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর একাধিক ঝুঁকি? এবার সেই রহস্যের উত্তর খুঁজতে বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে নেপাল সরকার। গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে শক্তি, পানিসম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয় সাত সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করেছে। এই দলে রয়েছেন জলবিজ্ঞানী, হিমবিজ্ঞানী, ভূতত্ত্ববিদ, রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞ, জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ও দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, বিপর্যয়ের উৎসস্থল থেকে শুরু করে নিচু এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল পর্যন্ত সরেজমিনে গবেষণা চালাবেন বিশেষজ্ঞরা। তারা পরীক্ষা করবেন—কোন ভৌত প্রক্রিয়ায় এই বিপর্যয়ের শুরু হয়েছিল এবং কীভাবে ভোটেকোশি নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে এর প্রভাব নিম্নাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক মূল্যায়নে এখনো দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট উৎস ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এবার শুধু বন্যা কিংবা ভারী বৃষ্টিপাত নয়, উচ্চ পর্বতে ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন, হিমবাহের অবস্থা, তাপমাত্রা এবং পানিপ্রবাহ—সবকিছু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হবে।
তদন্তে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টিও বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হবে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক তাপমাত্রা পরিবর্তন বা হিমবাহের পরিবর্তনের সঙ্গে এই বিপর্যয়ের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করবেন বিশেষজ্ঞরা। পানিনীতি ও শাসনবিশেষজ্ঞ দেবেশ বেলবাসের সমন্বয়ে গঠিত সাত সদস্যের প্যানেলে রয়েছেন জলবিজ্ঞানী নরেন্দ্র মান শাক্য, হিমবিজ্ঞানী রিজান ভক্ত কায়স্থ, রিমোট সেন্সিং বিশেষজ্ঞ উত্তম বাবু শ্রেষ্ঠা, ভূতত্ত্ববিদ মেঘরাজ ধীতাল, জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ হরি পণ্ডিত এবং দুর্যোগ-ঝুঁকিহ্রাস বিশেষজ্ঞ অনিল পোখরেল।
পানি ও শক্তি কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব টিশারাম বারালের ভাষায়, ঘটনাটি বিশ্বমানের মানদণ্ডেও বিরল। তাই বিস্তারিত গবেষণা ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এই তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা। ভোটেকোশি বিপর্যয়ে ত্রিশূলী করিডরজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে একই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় অন্য নদী ব্যবস্থায় ঘটলে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে, সেটিও খতিয়ে দেখবেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থাৎ নেপাল সরকারের এই তদন্ত শুধু অতীতের একটি ভয়াবহ দুর্যোগের কারণ খোঁজার জন্য নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন, সেই শিক্ষাও বের করে আনতে চায় সরকার। এখন বিশেষজ্ঞদের গবেষণার ফলের দিকেই নজর। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিশ্লেষণের পরই পরিষ্কার হবে—২৬ আগস্টের সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পেছনে আসলে কোন কোন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট ঝুঁকি কাজ করেছিল।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন