ঢাকা | |

ক্ষমতার জৌলুস নয়, মানুষের আস্থা

ক্ষমতার চেয়ারে বসে অনেকেই মানুষের কাছ থেকে আরও দূরে সরে যান। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই প্রচলিত চিত্র বদলানোর
  • আপলোড সময় : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:২৩ সময়
  • আপডেট সময় : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:২৩ সময়
ক্ষমতার জৌলুস নয়, মানুষের আস্থা

ক্ষমতার চেয়ারে বসে অনেকেই মানুষের কাছ থেকে আরও দূরে সরে যান। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই প্রচলিত চিত্র বদলানোর চেষ্টা কি করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান? গত ছয় মাসের কিছু সিদ্ধান্ত, আচরণ ও রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে অন্তত এমন একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—ক্ষমতার জৌলুস কমিয়ে মানুষের আরও কাছে যাওয়ার নতুন কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি তৈরি হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রীর দাপ্তরিক কাজে নিজের নাম ও পদের আগে অতিরিক্ত সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার না করা, অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল ও আড়ম্বর কমানোর নির্দেশ, সরকারি প্রচারণায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এড়িয়ে চলা এবং তার ছবিসংবলিত ব্যানার ব্যবহার না করার মতো পদক্ষেপগুলো আলোচনায় এসেছে। শুধু তাই নয়, নিজেই গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি দেখা, সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে রাস্তা বন্ধ না করা কিংবা আহত সেনাসদস্য ও দলীয় কর্মীদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার মতো ঘটনাও তার রাজনৈতিক আচরণের ভিন্ন দিক তুলে ধরেছে।


তার পোশাক ও জনসমক্ষে অনাড়ম্বর উপস্থিতিকেও তাই কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখছেন না অনেকে। কারণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করছে, সেটিও ক্ষমতার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গির একটি বার্তা বহন করে। ক্ষমতার দৃশ্যমান চাকচিক্য কমিয়ে সাধারণভাবে নিজেকে উপস্থাপন করলে নেতৃত্ব ও নাগরিকের মধ্যকার মানসিক দূরত্বও কমতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক ভাষায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আক্রমণ, পালটা আক্রমণ, বিদ্রূপ ও প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা রয়েছে। এর বিপরীতে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত আক্রমণে না নিয়ে তুলনামূলক সংযত ও শালীন ভাষায় মোকাবিলার যে প্রবণতা তারেক রহমান দেখাচ্ছেন, তা অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।


কারণ শীর্ষ নেতৃত্বের ভাষা ও আচরণের প্রভাব শুধু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। নেতারা যেভাবে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করেন, তৃণমূলের কর্মীরাও অনেক সময় সেটিকেই অনুসরণ করেন। ফলে নেতৃত্বের সংযত আচরণ মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষের কাছে ক্ষমতাকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশাসনকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা এবং নাগরিকের দৈনন্দিন সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগও এই ধারার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


তবে শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে মানুষের বাস্তব জীবনে পরিবর্তন কতটা এসেছে, তার ওপর। কৃষক সার ও কীটনাশক পাচ্ছেন কি না, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, তরুণদের কর্মসংস্থান হচ্ছে কি না, ব্যবসায়ীরা হয়রানিমুক্ত পরিবেশ পাচ্ছেন কি না, সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও সরকারি সেবা পাচ্ছেন কি না—এসবই হবে সরকারের কার্যকারিতা যাচাইয়ের মূল মাপকাঠি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার মানসিকতা। দীর্ঘ সময়ের একটি শাসনপর্বের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে সব সমস্যার সমাধান দ্রুত করা সম্ভব নয়—এমন বাস্তবতা স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো সংকটের কথাও তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন এবং সমাধানে সময় ও সহযোগিতা চেয়েছেন। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাকে দুর্বলতা না দেখে বিনয়ের প্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।


সব মিলিয়ে তারেক রহমানের গত ছয় মাসের পোশাক, প্রটোকলে সংযম, রাজনৈতিক বক্তব্য, জনসম্পৃক্ততা এবং সরকারের সীমাবদ্ধতা স্বীকার—এই বিষয়গুলোকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা কঠিন। একসঙ্গে বিবেচনা করলে এগুলো ক্ষমতার প্রচলিত জৌলুসের পরিবর্তে সংযম, জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততার একটি ভিন্ন ধারণার ইঙ্গিত দিতে পারে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারের গাড়িবহর বা প্রটোকলের জৌলুস মনে রাখে না। মনে রাখে, ক্ষমতাসীনরা মানুষের কতটা কাছে গিয়েছিল, জনগণের কথা কতটা শুনেছিল এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কতটা কাজে লাগিয়েছিল।


তাই প্রশ্নটা এখন শুধু ক্ষমতা কার হাতে—তা নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারেক রহমানের গত ছয় মাসের কর্মকাণ্ড যদি একই ধারায় এগিয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি হয়তো ধীরে ধীরে ক্ষমতার প্রদর্শন থেকে মানুষের আস্থার দিকে এবং কথার রাজনীতি থেকে কাজের রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
ধাপে ধাপে ঠকছেন মালদ্বীপের এক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি: হাসনাত আবদুল্লাহ

ধাপে ধাপে ঠকছেন মালদ্বীপের এক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি: হাসনাত আবদুল্লাহ