গ্যাসের তীব্র সংকটে যখন শিল্পকারখানার উৎপাদন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যন্ত বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে, তখন ব্যবসায়ীদের জন্য এলো গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ সংকট শুরুর আগের অবস্থায় ফিরতে পারে। অর্থাৎ এক থেকে দেড় মাস আগে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল, সেই পর্যায়ে সরবরাহ ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট, এর কারণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে কিছুদিন সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। এখন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে।
তবে শুধু সাময়িক সংকট মোকাবিলা নয়, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী জানান, তৃতীয় একটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের চুক্তির ভিত্তিতে গত এক মাসে এ বিষয়ে প্রস্তুতি এগিয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন টার্মিনালটি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার আশা করছে সরকার। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, বর্তমানে থাকা টার্মিনালগুলোর পাশাপাশি ২০২৮ সালের আগেই সম্ভব হলে তৃতীয় টার্মিনাল যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশে ভাসমান গ্যাস টার্মিনালের সংখ্যা পাঁচটিতে উন্নীত করার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।
শুধু আমদানিনির্ভরতার ওপর নির্ভর না করে দেশের অভ্যন্তরেও গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো হচ্ছে। মধ্যমেয়াদে প্রায় ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি স্থলভিত্তিক গ্যাস টার্মিনাল স্থাপন এবং জাতীয় গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও তেল, গ্যাস ও কয়লার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। তবে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য শক্তিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। তাই সরকারকে তার মেয়াদে পরিকল্পিতভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতাও চান তিনি। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদনেও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে। গৃহস্থালি পর্যায়েও ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তবে সরকারের দাবি, চলতি মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর সত্যিই কি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে? প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর থাকবে ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন