পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে জমে উঠেছে কেনাকাটার বাজার। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় মানুষের ভিড় বেড়েছে শপিংমল ও মার্কেটগুলোতে। বিশেষ করে শাড়ি ও কসমেটিকসের দোকানগুলোতে এখনো উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। এ বছরের ঈদ বাজারে নতুন করে নজর কাড়ছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি, যা ব্যতিক্রমী নকশা, রঙের বৈচিত্র্য ও আধুনিক ডিজাইনে ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে। টাঙ্গাইল শাড়ির সুনাম দীর্ঘদিনের। শত বছরের ঐতিহ্য বহন করা এই শাড়ির জন্য বিখ্যাত দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়নের চণ্ডী ও পাথরাইল গ্রাম। জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দুটি গ্রাম এখন পাইকার, মহাজন ও খুচরা ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা এখানে এসে শাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
এলাকায় রয়েছে টাঙ্গাইল কুটির, মৌ শাড়িঘর, রাধাশ্যাম শাড়িঘর, গোবিন্দ বসাক অ্যান্ড সন্স, হরিপদ বসাক অ্যান্ড সন্স, মনমোহন বসাক অ্যান্ড সন্স, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি এবং বটেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানিসহ শতাধিক কারখানা ও শোরুম। এসব প্রতিষ্ঠানে লাখো শাড়ি মজুত রয়েছে। ঈদের আগে আর কয়েক দিনই কেনাবেচা চলবে, তাই পাইকাররা এখন দ্রুত শাড়ি কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছেন।
রবিবারও তাঁতপল্লির কারখানাগুলোতে খটখট শব্দে শাড়ি বোনার কাজ চলতে দেখা গেছে। কারিগরদের এখনো ছুটি মেলেনি। ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় এক দশক আগে টাঙ্গাইলে ১ লাখ ২৪ হাজার তাঁত ছিল এবং এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ। তবে করোনা মহামারির সময় প্রায় ৪০ শতাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে যায় এবং শুধু পাথরাইল এলাকাতেই বন্ধ হয়ে পড়ে প্রায় পাঁচ হাজার তাঁত। এতে অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন এবং বহু কারিগর অন্য পেশায় চলে যান। তবে গত তিন বছরে ধীরে ধীরে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এখন জামদানি, সিল্ক, সফট সিল্ক, হাফ সিল্ক ও টিস্যু সিল্কের পাশাপাশি থ্রি-পিস ও পাঞ্জাবির কাপড়ও তৈরি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাতে তৈরি শাড়ির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির কারখানাতেও এখন টাঙ্গাইল শাড়ি উৎপাদন হচ্ছে। হাতে বোনা জামদানির দাম বেশি—একটি মানসম্মত জামদানির মূল্য ৮ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে পাওয়ার লুমে তৈরি শাড়ির দাম তুলনামূলক কম, অনেক ক্ষেত্রে ৮০০ থেকে শুরু করে কয়েক হাজার টাকার মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, এবার ঈদকে সামনে রেখে প্রায় ২৪ লাখ পিস শাড়ি উৎপাদন হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিনশ থেকে চারশ কোটি টাকা। বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও টাঙ্গাইল শাড়ির বিক্রি বাড়ছে।
শুদ্ধ তাঁত কারখানার মালিক কালাচাঁদ বসাক জানান, আদি তাঁতে একটি রেশম সুতার জামদানি শাড়ি তৈরি করতে অনেক সময় লাগে—কখনো কখনো ৮ থেকে ১০ দিনও লেগে যায়। এজন্য কারিগরদের ভালো মজুরি দিতে হয়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। ফলে অনেকেই এখন পাওয়ার লুমে ঝুঁকছেন, যেখানে কম সময়ে তুলনামূলক কম দামে শাড়ি তৈরি করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল শাড়ি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, যা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও পরিচিত করে তুলেছে। এখন ঢাকার জামদানির পাশাপাশি টাঙ্গাইলের পাওয়ার লুমে তৈরি জামদানি শাড়িও বাজারে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন