মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। কোনো পক্ষই পিছু হটার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। একদিকে সামরিক হামলা চলছে, অন্যদিকে পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে বাড়ছে প্রাণহানি, ধ্বংস হচ্ছে অবকাঠামো এবং বিশ্ব অর্থনীতিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার পর দেশটি প্রতিশোধমূলক হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। ইরান ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। অপরদিকে ইসরাইলও ইরান এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থানে তীব্র আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।
ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা:
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানে ইরানের রাজধানী তেহরান, বুশেহর ও উর্মিয়াসহ একাধিক শহরে হামলা চালানো হয়েছে। পারদিস ও পারচিন এলাকাতেও কয়েক ঘণ্টা ধরে বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইসফাহান প্রদেশের গভর্নরেট জানিয়েছে, মঙ্গলবারের হামলায় তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া কেরমানে একটি সেনা বিমানঘাঁটিতে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। মিনাব এলাকার একটি স্কুলে হামলার সময় সেখানে উপস্থিত ৩৫ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর মধ্যে ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে পাঁচটি বড় হাসপাতালসহ একাধিক জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তেহরানের জরুরি বিভাগের প্রধান জানিয়েছেন, সোমবারের বিমান হামলায় অন্তত আটটি অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে ইসরাইল লেবাননে স্থল অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন সেনাবাহিনী ওমান উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনীর ১১টি জাহাজ ধ্বংস করার দাবি করেছে।
প্রেসিডেন্ট কার্যালয়েও হামলার দাবি:
ইসরাইলি বিমান বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনেও ব্যাপক গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ইসরাইলি বাহিনীর মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনি পূর্বে ওই কম্পাউন্ড ব্যবহার করেছিলেন।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত ৭৪২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৭৬ জন শিশু রয়েছে। এদিকে ইসরাইলি হামলায় ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার তিনটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, সেখানে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইরানের পাল্টা হামলা:
ইরানও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এতে ভবনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সীমিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুয়েতেও মার্কিন দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ইরান দাবি করেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ব্যবস্থা এফপিএস–১৩২ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। কাতারের দোহা শহরেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সঙ্গে দেশটি সাময়িকভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ওমানের দুকম বন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাংকেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে লেবানন থেকে হিজবুল্লাহও ইসরাইলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি:
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, এই পথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
আলোচনার পথ বন্ধ:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর ইরান আলোচনার প্রস্তাব দিলেও এখন সেই সময় পেরিয়ে গেছে। এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে ইরানে স্থল অভিযান চালাতেও যুক্তরাষ্ট্র দ্বিধা করবে না। ইতোমধ্যে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সেনাসদস্য নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। এদিকে ইরানও স্পষ্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় তারা যাবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের বাহরাইন, মিশর, ইরান, ইরাক, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেনসহ মোট ১৪টি দেশ দ্রুত ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন