সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলো ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট। জাতিসংঘ কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা কেউই পারছে না এই দ্বন্দ্ব মীমাংসা করতে। সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। মৃত্যুর খাতায় যুক্ত হচ্ছে বহু অসহায় ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি। একদিকে ইসরায়েলের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, অন্যদিকে ফিলিস্তিনের মানুষের নিজ বাসভূমে নিরাপদে বসবাসের স্বপ্ন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ইসরায়েলের সমর্থক হওয়ায় এই সংকটে বেশি অসহায় ফিলিস্তিনিরাই। তাদের কান্না আর হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও তাদের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গত শনিবার (৭ অক্টোবর) সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের রকেট হামলায় অন্তত ২৫০ ইসরাইলি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৫০০ মানুষ। গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে পাঁচ হাজার রকেট ছোড়া হলে এই ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে ইসরায়েলের পাল্টা হামলায় গাজা উপত্যকায় প্রাণ গেছে অন্তত ২৩২ জন ফিলিস্তিনির। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ হাজার ৭৯০ জন। চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গাজার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দা গতকাল শনিবার সারা রাত অন্ধকারে কাটিয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ঘনবসতি–অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করছে। এসব হামলার পাল্টা জবাবে হামাস নিক্ষিপ্ত রকেটের বেশির ভাগই মাঝ আকাশে প্রতিহত করেছে ইসরায়েল। বন্দী ফিলিস্তিনিদের মুক্তির দাবিতে নতুন করে আবার সংঘাতে লিপ্ত হয় হামাস ইসরায়েল। বন্দী ইসরায়েল সেনাদের মুক্তির শর্তও রেখেছে তা-ই।
এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে পশ্চিম তীরের জেনিন শরণার্থীশিবিরে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল বাহিনী। এই আক্রমণ ছিল গত দুই দশকের মধ্যে ইসরায়েলের পরিচালিত সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। প্রথমে আকাশ থেকে ড্রোন আক্রমণ, পরে সাঁজোয়া যান এবং বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল। হাজার হাজার মানুষ জীবন বাঁচাতে ছোটাছুটি করতে থাকে তখন। এর আগে ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি বাহিনী এই এলাকায় পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, যাতে ৫২ জন ফিলিস্তিনি ও ২৩ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছিলেন। এসব হামলায় আন্তর্জাতিক পরাশক্তি সমাজের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা সবসময়ই ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়েছে।
১৮৯৭ সাল থেকে মূলত ইহুদিরা নিজেদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ১৯১৭ সালে তুরস্কের সেনাদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করে ব্রিটেন। সেই থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ভূমি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস আর্থার বেলফোর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্রিটেনের অবস্থানের কথা ঘোষণা করেন। সে 'বেলফোর ঘোষণা' ই ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের সূচনা করে।
এরপরে গাজা থেকে দুই মাইল উত্তরে কিবুটস এলাকায় ১৯৩০ এর দশকে পোল্যান্ড থেকে আসা ইহুদীরা কৃষি খামার গড়ে তুলতে শুরু করে। ইহুদিদের পাশেই ছিল ফিলিস্তিনী আরবদের বসবাস। সেখানে আরবদেরও কৃষি খামার ছিল। তারা কয়েক শতাব্দী ধরে সেখানে বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবে বসবাস করছিলেন। তবে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনীরা বুঝতে পারলেন যে তারা তাদের দেশের ভূমি হারাচ্ছেন। ইহুদিরা দলে-দলে সেখানে জমি ক্রয় করতে থাকেন আর বাড়তে থাকে তাদের ক্ষমতার দাপট। অসহায় হয়ে পড়েন ফিলিস্তিনিরা।
ক্ষমতা, পরাশক্তি দেশগুলোর সমর্থন সবই ছিল ইসরায়েলের। প্রয়োজন ছিল শুধু স্বীকৃতির। আরব দেশগুলো থেকেই স্বীকৃতি আদায়ের পরিকল্পনা করলো তারা।
১৯৬৭ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পশ্চিম তীরের দখল নেয় ইসরায়েল। ফলে শরণার্থীতে পরিণত হয় ফিলিস্তিনের লাখো মানুষ। জীবন ও জীবিকার তাগিদে ব্যাপক মানুষ বাস্তুচ্যুত ও শরণার্থীতে পরিণত হয়ে প্রতিবেশী আরব দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে। নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদকৃত ফিলিস্তিনিদের বদলে সেখানে আশ্রয় গেড়েছে ইসরায়েলের প্রায় পাঁচ লাখ নাগরিক। ইসরায়েলের ভাষায় যারা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, ফিলিস্তিনের ভাষায় তারা কিন্তু মাতৃভূমির অধিকার রক্ষায় অকুতোভয় সংগ্রামী যোদ্ধা।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ সমস্যার সবচেয়ে বড় যে সংকট এখন পর্যন্ত জিইয়ে রাখা হয়েছে, তা হলো ফিলিস্তিনের শরণার্থী সমস্যা। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস রিলিফস অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সিতে (ইউএনআরডাব্লিউএ) নিবন্ধিত ফিলিস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা অন্তত ৫৩ লাখ। এর মধ্যে জর্দানে রয়েছেন ২০ লাখ, সিরিয়ায় রয়েছেন পাঁচ লাখ ২৬ হাজার, লেবাননে পাঁচ লাখ শরণার্থী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের দুর্দশা আরো বেড়েছে।এরই মধ্যে ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য সব ধরনের মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএনআরডাব্লিউএকে তহবিল দেওয়া বন্ধ করে দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য ১৯৬৭ সালের আরব যুদ্ধে তারা পূর্ব জেরুসালেমও দখল করে নেয় এবং জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী বলে গণ্য করে। জেরুজালেমের মাটি ছাড়তে রাজি ছিল না ফিলিস্তিনিরাও। সংঘাত নাকি মীমাংসা এই সিদ্ধান্তে ফিলিস্তিনিদের মধ্যেই মতের বিভেদ তৈরি হতে লাগলো। মুক্তিকামী পিএলও এবং কট্টর হামাসদের মধ্যেই নানাবিধ মতবিরোধ হতে শুরু করে।
এরই মধ্যে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইসরাইল এবং পিএলওর মধ্যে সরাসরি এই চুক্তি সংগঠিত হয়েছিল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রাবিন এবং পিএলও নেতা ইয়ানের আরাফাতের মধ্যে অত্যন্ত গোপনে এই চুক্তি হয়।
এর শর্ত ছিল, পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে এবং ‘ফিলিস্তিনি অন্তর্বর্তীকালীন স্বশাসন কর্তৃপক্ষ’ পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব নেবে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান ইসরাইল-ফিলিস্তিনের সংকট নিরসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তই ছিল দুই পক্ষের জন্য আলাদা দুটি দেশ। আর এই দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের তত্ত্বটি এসেছিলো ১৯৯৩ সালে অসলো শান্তি আলোচনার মাধ্যমে। এবং দু'পক্ষই তাতে সম্মত হয়েছিল তাতে।
কিন্তু এর বিরোধিতা করে হামাস। হামাস মূলত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে কোনো ইহুদি রাষ্ট্র চায়না। কোনো মধ্যস্থতায় ইসরায়েল রাষ্ট্রকে সমর্থন দিতে চায়না সংগঠনটি।
এরপর ১৯৭৯ সালে শান্তি চুক্তি অনুযায়ী মিশরকে সিনাই উপত্যকা ফিরিয়ে দেয় ইসরোয়েল। বিনিময়ে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে মিশর। আরবদের মধ্যে মিশরই প্রথম ইসরায়েলকে সমর্থন করে। শান্তি চুক্তিতে মিসরের পক্ষে দেশটির প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী মেনাচিম বেগিন স্বাক্ষর করেন। ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটনে এই শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
অন্যদিকে ইসরায়েল-জর্ডান শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯৪ সালের ২৬ অক্টোবর। জর্ডান ছিল দ্বিতীয় আরব রাষ্ট্র যে মিশরের পর ইসরায়েলের সাথে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে ভূমি, পানি, ব্যবসা এবং ভ্রমণের ক্ষেত্রে সম্পর্ক স্থাপিত করে।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনে এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতায় পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ইসরায়েলের সাথে বৈরি সম্পর্ক ছিলো এমন অনেক মুসলিম দেশ এখন ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের তাই আদৌ সমাধান হবে কিনা তা অনিশ্চিত।ইতিমধ্যে তাদের মধ্যে অনেক মীমাংসা চুক্তি হলেও কার্যত কোনোটিই সুখবর আনতে পারেনি। পরাশক্তি দেশগুলোর ইসরায়েল সমর্থন অনেকাংশেই এই সংকটকে টিকিয়ে রেখেছে বলে অনেক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন