ঢাকা | |
সংবাদ শিরোনাম :
মদ্যপান শেষে হে'রো'ইন খুঁজতে টঙ্গীর মাঠে যান তাহসিফ মধুমতির বুকে নৌকা বাইচ, তীরে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস গঙ্গার পানি না এলে ভারতের পণ্য বাংলাদেশে আসবে না: নাহিদ ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রকাশ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি সীমান্তের ওপার থেকে শ্রমিকদের ইন্ধন দিয়ে অস্থিরতার চেষ্টা চলছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমরা এক দফার দিকে যাচ্ছি: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কক্সবাজারের ইনানীতে নলকূপ খননের সময় গ্যাস উদগীরণ, আগুন জ্বলছে জয়পুরহাটে কোটি টাকার বেশি মূল্যের বেলেপাথরের খণ্ড উদ্ধার, আটক ১ বিএনপি-আওয়ামী লীগও প্রস্তাব দিয়েছিল, আমরা লোভ করিনি: চরমোনাই পীর ইউক্রেনের রুশ নিয়ন্ত্রিত ওলেশকিতে শেষ হলো যুদ্ধবিরতি

বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক সংকটে শিখন ঘাটতি, মুখস্থ নির্ভরতায় ভিত দুর্বল

১২ বছর ধরে ইংরেজি পড়েও অনেক শিক্ষার্থীর কাটছে না ভাষাভীতি। আর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি পড়েও তৈরি হচ্ছে না
  • আপলোড সময় : ২ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:১৫ সময়
  • আপডেট সময় : ২ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:১৫ সময়
বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক সংকটে শিখন ঘাটতি, মুখস্থ নির্ভরতায় ভিত দুর্বল

১২ বছর ধরে ইংরেজি পড়েও অনেক শিক্ষার্থীর কাটছে না ভাষাভীতি। আর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি পড়েও তৈরি হচ্ছে না প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের সংকট। দীর্ঘদিনের এই ঘাটতি, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এবং শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত পাঠদানের প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়েছে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে। ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে ৩৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে ফেল করেছে ২৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ।


প্রাথমিক পর্যায় থেকেই দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি বাধ্যতামূলক। উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার আগে টানা ১২ বছর এই বিষয় পড়তে হয়। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পড়াশোনার পরও অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজিতে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা, পড়া কিংবা লেখার ক্ষেত্রে দুর্বল থেকে যাচ্ছে। কারণ, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো ইংরেজি শেখানোর প্রধান পদ্ধতি মুখস্থনির্ভর। ফলে ভাষাটি বাস্তবে ব্যবহারের পরিবর্তে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য কিছু নিয়ম ও উত্তর মুখস্থ করেই পার করছে শিক্ষার্থীরা।


বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২ হাজার ৬২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই। বর্তমানে ইংরেজি পড়াচ্ছেন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ৫১ হাজার ৩৬০ জনের ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর কিংবা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়েও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ১৩ বছর আগে বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক পদ সৃষ্টি এবং নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে অনেক সরকারি কলেজে নিজস্ব আইসিটি শিক্ষক নেই। এমনকি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও এই বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি।


বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের ৩ হাজার ৮৬১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে গণিত, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, ব্যবসায় শিক্ষা কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকেরা আইসিটি পড়াচ্ছেন। পাশাপাশি এই বিষয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই। ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যেও ৫৬ শতাংশের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক ক্লাসও নিয়মিত হচ্ছে না। শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও চিন্তাশক্তি বিকাশের পথে বড় বাধা। শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য মুখস্থ করার প্রবণতা সাময়িক ফল দিলেও বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করতে পারে না।


ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ মনজুর আহমেদ বলেন, করোনা মহামারির পর থেকেই শিক্ষার মান ধারাবাহিকভাবে কমছিল। একই সঙ্গে দক্ষ শিক্ষকসংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাই এবারের খারাপ ফলাফল পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত না হলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি মনে করেন, ফলাফলের জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করা ঠিক হবে না। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতার সমস্যাও আছে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় সমন্বিত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষা খাতের উন্নয়নে আগে যেসব সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।


ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এবারের ফলাফল শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকার চিত্রও তুলে ধরেছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত ছিল। যারা নিয়মিত ক্লাস করেছে এবং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, তাদের মধ্যেই পাসের হার তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, নটর ডেম কলেজের এক শিক্ষকের মতে, করোনা মহামারির পর থেকেই এবারের পরীক্ষার্থীরা শিখন ঘাটতির মধ্যে ছিল। মৌলিক জ্ঞানের দুর্বলতা, পাঠ্যবইয়ের প্রতি অনাগ্রহ, ঘন ঘন পাঠ্যসূচি পরিবর্তন এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলেছে। পরীক্ষার সময় বন্যা পরিস্থিতির অস্থিরতাও শিক্ষার্থীদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।


মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার আরও গভীর চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণ সমস্যা সমাধান এবং বিশ্লেষণী চিন্তার দক্ষতায় অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি সহজ পাঠ্যাংশ বুঝতে কিংবা মৌলিক গাণিতিক হিসাব করতেও তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ইংরেজিতে নিজস্বভাবে লেখার দক্ষতার ঘাটতিও প্রকট। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই এই বিষয়ে মেধার শীর্ষ স্তরে পৌঁছাতে পারছে না। আবার শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে রংপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে।


অন্যদিকে, আইসিটি শিক্ষায় পর্যাপ্ত কম্পিউটার, ল্যাব সুবিধা এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না। সব মিলিয়ে ইংরেজি ও আইসিটিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলাফল শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষকসংকট, প্রশিক্ষণের অভাব, মুখস্থনির্ভর পাঠদান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা বাড়াতে হলে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শেখার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রোজার আগেই সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৪ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

রোজার আগেই সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৪ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব