কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারণাবিরোধী অভিযানে মাত্র নয় মাসে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশসহ ৮৭টি দেশের মোট ৫২ হাজার ৩৯ জন বিদেশি নাগরিককে দেশটি থেকে বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই বাংলাদেশিদের সবাই কি প্রতারণার সঙ্গে জড়িত, নাকি তাঁদের মধ্যে অনেকে মানবপাচারের শিকার হয়ে জোর করে অপরাধমূলক কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। আর এ কারণেই বহিষ্কৃত বাংলাদেশিদের পরিচয় ও প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করে তাঁদের সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
কম্বোডিয়ার অভিবাসন বিভাগের সরকারি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে তিন হাজার ১০৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ৫২ হাজার ৩৯ জন বিদেশি নাগরিককে আটক ও বহিষ্কার করা হয়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বহিষ্কৃত বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা বেড়েছে ৪১ হাজার ৬৮৫ জন। বৃদ্ধির হার চার শ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ, কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারণা ও অবৈধ কর্মকাণ্ডবিরোধী অভিযান এবার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ২৩ হাজার চীনা নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া আট হাজারের বেশি ইন্দোনেশীয়, চার হাজারের বেশি ভিয়েতনামি এবং তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সময়ে আড়াই হাজারের বেশি পাকিস্তানি, মিয়ানমারের প্রায় দুই হাজার এবং দেড় হাজারের বেশি থাই নাগরিকও দেশটি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বহিষ্কৃত বিদেশিদের সবাইকে একই ধরনের অপরাধে জড়িত হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি। অভিবাসন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩৮টি দেশের ১৮ হাজারের বেশি নাগরিককে সরাসরি অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বহিষ্কৃত বাংলাদেশিদের মধ্যে কতজন সরাসরি প্রতারণায় জড়িত ছিলেন এবং কতজন মানবপাচারের শিকার হয়ে এসব কাজে বাধ্য হয়েছেন, তার আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে বহিষ্কৃত বাংলাদেশিদের প্রকৃত অবস্থা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও সুরক্ষায় কাজ করা সংগঠন অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন।
সংগঠনটির বক্তব্য, মানবপাচারের শিকার হয়ে যাঁদের জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়েছে, যথাযথ যাচাই ছাড়াই তাঁদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। বরং কারা অপরাধে জড়িত এবং কারা পাচারকারীদের প্রতারণার শিকার, তা আলাদাভাবে শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সংগঠনটি আরও বলেছে, কম্বোডিয়া থেকে বহিষ্কৃত কতজন বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন এবং কতজন এখনো সেখানে আটকে রয়েছেন, তার সঠিক তালিকা তৈরি করা জরুরি। যারা এখনো আটকে আছেন, তাঁদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি দেশে ফেরা ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
এখানেই শেষ নয়, মানবপাচারের ঝুঁকি কমাতেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা যেন দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে অন্য কোনো দেশে গিয়ে আবারও পাচার বা প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোকে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে কম্বোডিয়া থেকে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশির বহিষ্কারের ঘটনা শুধু অনলাইন প্রতারণার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানবপাচার ও জোরপূর্বক অপরাধে যুক্ত করার আশঙ্কাও। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, বহিষ্কৃত বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রকৃত অপরাধী ও মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের নিরপেক্ষভাবে শনাক্ত করা। কারণ, অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি পাচারের শিকার মানুষদের উদ্ধার, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন