উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা এবার আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সীমান্তের কাছে উত্তর কোরিয়ার ভারী কামান প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাল্টাপাল্টি চিঠি পাঠিয়েছে দুই দেশ। সেপ্টেম্বরের স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় একে অপরকে দায়ী করার মধ্যেই পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, কয়েক দশক ধরে বিরোধে জড়িয়ে থাকা দুই কোরিয়ার মধ্যে এই উত্তেজনা কি আরও বড় সামরিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে?
সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সময় উত্তর কোরিয়ার একটি কামান দৃশ্যমান অবস্থায় দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইউনহাপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ত্রটি ১২২ মিলিমিটারের স্বচালিত হাউইটজার। পাশাপাশি দক্ষিণমুখী কামানের নলসহ তিনটি সাঁজোয়া যানও সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী অসামরিক অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন সেনাকে বেড়া নির্মাণের কাজ করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্তের কাছে এভাবে ভারী অস্ত্র প্রকাশ্যে রাখার ঘটনা বিরল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম ইউল-চুলের মতে, কামানটি এত স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করার বিষয়টি অস্বাভাবিক। তাঁর ব্যাখ্যায়, এর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া আলোচনার পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সীমান্তনীতি কার্যকর করার বার্তা দিতে চাইতে পারে। এদিকে, সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নতুন করে অভিযোগ তুলেছে পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার পাঠানো চিঠিতে দেশটি দাবি করেছে, তাদের সীমান্তবর্তী নির্মাণকাজকে সামরিক অনুপ্রবেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে দক্ষিণ কোরিয়া মাইন বিস্ফোরণের ঘটনাকে ব্যবহার করছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হলে তারা আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। এর পরিণতির দায় দক্ষিণ কোরিয়াকেই বহন করতে হবে বলেও সতর্ক করেছে পিয়ংইয়ং। এর আগে গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। তাতে অভিযোগ করা হয়, গত ২১ সেপ্টেম্বর অসামরিক অঞ্চলে যে স্থলমাইন বিস্ফোরণ ঘটে, সেটি উত্তর কোরিয়ার সেনাদের পুঁতে রাখা মাইনের কারণে হয়েছে। ওই বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন, যাঁদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী ও জাতিসংঘ কমান্ডের তদন্তে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনকে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘ কমান্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তের ওপারে মাইন পুঁতে রাখা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। তবে পিয়ংইয়ং এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। উল্টো উত্তর কোরিয়ার অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা তাদের কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। পিয়ংইয়ং এই ঘটনাকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলেও দাবি করেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক চিঠিতে আগের অভিযোগেরই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে তাদের কর্মকাণ্ডকে যৌক্তিক প্রমাণের চেষ্টা চলছে বলে মনে করছে সিউল।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের অবসান হয়েছিল যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে, পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে নয়। ফলে কয়েক দশক পার হলেও দুই দেশের মধ্যে সামরিক সতর্কতা ও নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জোরদার করেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। পিয়ংইয়ং এই সহযোগিতাকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে, আর সিউল উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক মনে করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, সীমান্তে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে দ্রুত সংঘাত ছড়িয়ে পড়া। সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান, স্থলমাইন, সতর্কতামূলক গুলি এবং ভারী অস্ত্রের উপস্থিতিতে সামান্য ভুল হিসাবও বড় সামরিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এসব ঘটনা সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূচনা করেছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে দুই দেশের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের ওপর।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন