জাপান সফরে গিয়ে বাংলাদেশের জন্য কত বড় বিনিয়োগের দরজা খুলতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান? মেট্রোরেলের ব্যয় কমানো থেকে শুরু করে জাপানি ঋণের সুদের হার হ্রাস, নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন এবং হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে এই সফর ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় প্রত্যাশা। বিশেষ করে প্রায় ১৩৮০ কোটি নয়, বরং ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব সামনে রেখে টোকিওর সঙ্গে ঢাকার আলোচনায় এবার গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে আজ সোমবার টোকিও যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই নেতার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হবে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে মেট্রোরেলসহ চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় কমানো এবং জাপান থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার হ্রাসের বিষয়টি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণেও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
সফরকে সামনে রেখে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিবহন ও নগর যোগাযোগ খাতে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়িসহ শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং উৎপাদন শিল্প, অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি ও গাড়ি নির্মাণ খাতে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোতে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার এবং কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, সামুদ্রিক অর্থনীতি, পর্যটন ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতে আরও ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে পাঁচ থেকে আটটি চুক্তি কিংবা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রস্তাবিত সহায়তার মধ্যে বাজেট সহায়তার জন্য প্রায় ৩০ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। মঙ্গলবার শীর্ষ বৈঠকের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। বৈঠক শেষে দুই নেতা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবেন। একই দিন জাপানের চিবা অঞ্চলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন এবং একটি সরবরাহব্যবস্থার কেন্দ্র ঘুরে দেখার কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
সফরের তৃতীয় দিনে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাপানের বিভিন্ন বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির সম্ভাবনা গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরির বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।
বৃহস্পতিবার সফরের শেষ দিনে নাগোয়া শহরে গিয়ে টয়োটার গাড়ি তৈরির কারখানা ও শিল্পপ্রযুক্তিবিষয়ক জাদুঘর পরিদর্শন করবেন তারেক রহমান। এরপর টোকিও ফিরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। সফরসঙ্গী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকছেন তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। এবার সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় কমানো এবং বাংলাদেশের পণ্যের জন্য জাপানের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে কতটা অগ্রগতি আসে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে দুই দেশের মানুষের।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন