ঢাকা | |
সংবাদ শিরোনাম :

বড়পুকুরিয়ার কয়লা উন্মুক্ত খননের চিন্তা সরকারের

দেশের মাটির নিচে থাকা বিপুল কয়লা কি এবার বড় পরিসরে তোলা হবে? প্রায় দুই দশকের বিতর্ক ও সিদ্ধান্তহীনতার
  • আপলোড সময় : ৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৫৮ সময়
  • আপডেট সময় : ৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৫৮ সময়
বড়পুকুরিয়ার কয়লা উন্মুক্ত খননের চিন্তা সরকারের

দেশের মাটির নিচে থাকা বিপুল কয়লা কি এবার বড় পরিসরে তোলা হবে? প্রায় দুই দশকের বিতর্ক ও সিদ্ধান্তহীনতার পর বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তর ও দক্ষিণ অংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই দুই অংশ থেকে প্রায় ১৭ কোটি টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে। বছরে ৬০ লাখ টন করে উত্তোলন করা গেলে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি।


জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানিতে বাড়তি চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বড়পুকুরিয়ায় ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হলেও এবার খনির উত্তর ও দক্ষিণ অংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে বড় পরিসরে কয়লা তোলার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন ও দিকনির্দেশনা চেয়ে গত ২ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও খনি উন্নয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় সাত থেকে আট বছর সময় লাগতে পারে।


এই পরিকল্পনার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জমি অধিগ্রহণ, প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার মানুষের পুনর্বাসন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলা। ফলে বিপুল পরিমাণ কয়লা মজুত থাকলেও তা উত্তোলন করা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটি নির্ভর করবে বিস্তারিত সমীক্ষার ফলাফলের ওপর। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় বড়পুকুরিয়া খনির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি। সেখানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতিও জানানো হয়। বিদ্যমান ও নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আমদানিকৃত কয়লার পরিবর্তে দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়ানোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।


বড়পুকুরিয়া খনির উত্তরাংশের আয়তন ২ দশমিক ৮১ বর্গকিলোমিটার এবং দক্ষিণাংশের আয়তন ২ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার। দুই অংশ মিলিয়ে উন্মুক্ত খনন এলাকার সম্ভাব্য আয়তন প্রায় ৫ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার। উত্তরাংশে প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টন এবং দক্ষিণাংশে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টন কয়লা মজুত রয়েছে। সব মিলিয়ে মজুত প্রায় ১৮ কোটি ৯০ লাখ টন। এর ৯০ শতাংশ উত্তোলন করা সম্ভব ধরে প্রায় ১৭ কোটি টন উত্তোলনযোগ্য কয়লা রয়েছে বলে হিসাব করেছে কোম্পানিটি।


তথ্য অনুযায়ী, দুই অংশে কয়লার স্তর প্রায় ১১৮ থেকে ২৫৬ মিটার গভীরে রয়েছে। বর্তমান ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে মোট মজুতের মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে। বিপরীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে প্রায় ৯০ শতাংশ কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। কোম্পানির হিসাবে, উত্তরাংশে এক টন কয়লার তুলনায় ওপরের মাটি অপসারণের অনুপাত ৩ দশমিক ৩ এবং দক্ষিণাংশে ৬ দশমিক ৩। এই অনুপাত তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা ও খননঝুঁকিও ভূগর্ভস্থ পদ্ধতির তুলনায় কম হতে পারে। দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়ানো গেলে কয়লা আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানোর সুযোগও তৈরি হবে। পাশাপাশি খনন এলাকায় কাওলিন, ক্লে ও সিলিকা স্যান্ড পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সিরামিক, মৃৎশিল্প ও কাচশিল্পে ব্যবহার করা যেতে পারে।


বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালের একটি সমীক্ষায় পানি ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য পদ্ধতি তুলে ধরে বিস্তারিত কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জন টি বয়েড পরিবেশ, ভূগর্ভস্থ পানি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার পরামর্শ দেয়। ২০১৯ সালেও জার্মান বিশেষজ্ঞ ড. থমাস ভন স্কয়ার্জনবার্গ উন্মুক্ত খননের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করেন। এরপর ২০২৩ ও ২০২৫ সালেও সমীক্ষার অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২ জুলাই আবারও বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শের জন্য নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।


এদিকে বড়পুকুরিয়ার বর্তমান খনন নিয়েও রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় অংশে ভূতাত্ত্বিক মজুত রয়েছে প্রায় ২২ কোটি ১০ লাখ টন। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেখান থেকে উত্তোলন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার টন। বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১০ লাখ টন।


চলমান চুক্তিতে ৪৫ লাখ টন কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে প্রায় ৩৮ লাখ ৩৫ হাজার টন। বাকি রয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬৬ হাজার টন। পেট্রোবাংলার একটি কমিটি আরও প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন উত্তোলনের সুপারিশ করেছে। অনুমোদন মিললে মোট প্রায় ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার টন কয়লা উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এরপর চীনা কোম্পানির সঙ্গে নতুন চুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালু রাখতে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের দলিল তৈরির কাজও চলছে। তবে কেন্দ্রীয় অংশে ২০২৭ সালের পর উত্তোলনযোগ্য কয়লা শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে নতুন অংশে উৎপাদন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত খনি বন্ধ থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।


শুধু বড়পুকুরিয়া নয়, দেশের অন্যান্য কয়লাক্ষেত্র নিয়েও নতুন করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জামালগঞ্জের উত্তর-পশ্চিমের ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বছরে ২০ লাখ টন করে ৩০ বছরে প্রায় ৬ কোটি টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ৩০ মাসের প্রাথমিক সমীক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে। খালাসপীরেও একই উৎপাদন লক্ষ্যে ৪৮ মাসের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর দীঘিপাড়ায় বছরে ৩০ লাখ টন করে ৩০ বছরে প্রায় ৯ কোটি টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।


অর্থাৎ, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় কয়লা ব্যবহারের নতুন পরিকল্পনা সামনে এসেছে। তবে বড়পুকুরিয়ার বিপুল কয়লা মজুত বাস্তবে কতটা উত্তোলন করা যাবে, তা নির্ধারণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারিগরি সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় মানুষের পুনর্বাসন ও মতামত।

  • বিষয়:

নিউজটি আপডেট করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
পদত্যাগ করেছেন বিএনপির এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, আসন শূন্য ঘোষণা

পদত্যাগ করেছেন বিএনপির এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, আসন শূন্য ঘোষণা