মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হামলা ও লুটপাটে প্রায় অচল হয়ে যাওয়ার পর আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ভবনের দেয়াল, দরজা-জানালা আর রঙের কাজ এগোলেও আগের মতো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা ফিরতে এখনো বাকি অনেক কিছু। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও আসবাব না থাকায় আপাতত টিনের ছাউনির নিচেই সীমিত পরিসরে চলছে রোগী দেখা ও টিকাদান।
ঢাকার মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এখন দ্রুতগতিতে সংস্কারকাজ চলছে। নতুন দরজা-জানালা বসানো হয়েছে, বিভিন্ন কক্ষে চলছে রঙের কাজ। ভাঙা দেয়াল মেরামত, নতুন গ্রিল বসানো, পানির সংযোগ ও শৌচাগার সংস্কারের কাজও এগিয়ে চলছে। তবে ভবনের ভেতরের সব কক্ষ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। তাই শনিবার কেন্দ্রের মূল ভবনের বাইরে টিনের ছাউনির নিচে শিশুদের টিকা দেওয়া এবং নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ দেওয়ার কাজ চলেছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মোট ৫৬ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ শিশুকে টিকা দেওয়া হয় এবং ২১ জন নারী স্বাস্থ্যসেবা নেন। অথচ হামলার আগে এই কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ মানুষ সেবা নিতেন। তাদের বড় একটি অংশ ছিলেন নারী ও গর্ভবতী মা। প্রতিদিন প্রায় একশ শিশুকে টিকাও দেওয়া হতো।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে। পরে ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করা হয়। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনা ও দেয়ালও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। হামলার পর কেন্দ্রটির সামনের ও পেছনের বারান্দার দেয়াল ভেঙে দেওয়া অংশে নতুন করে ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টার করা হয়েছে। বিভিন্ন কক্ষে নতুন লোহার গ্রিল, জানালার কপাট ও দরজা বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। কর্মীদের বসা ও খাবারের কক্ষ, পাশের দাপ্তরিক ভবন, পানির ট্যাংক এবং শৌচাগারেও সংস্কার চলছে।
পেছনের সীমানাদেয়ালের ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টারের কাজও শেষ হয়েছে। এখন সেখানে রঙের কাজ করার প্রস্তুতি চলছে। তবে শুধু ভবন মেরামত করলেই আগের মতো স্বাস্থ্যসেবা চালু করা সম্ভব নয়। কারণ হামলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও আসবাব লুট বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার জানান, দুটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন ও সেগুলোর রঙিন প্রিন্টার, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, জেনারেটর এবং তিনটি বড় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র লুট করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা সেবার বিভিন্ন উপকরণ, রোগীদের ব্যবহারের বিশেষ বিছানা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি এবং জীবাণুমুক্ত করার যন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চিকিৎসকদের বসার স্থান, টেবিল-চেয়ার, ফাইল রাখার ক্যাবিনেট, স্টিলের আলমারি এবং ওষুধ রাখার আসবাবও লুটপাট বা ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। এখনো উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর সবকিছু পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হয়নি। কোন যন্ত্র ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আছে আর কোনগুলো নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে, সেটিও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
নাসরিন আখতার বলেন, সংস্কারের কাজ শেষ হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। শুরুতে যত দ্রুত কাজ শেষ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা হচ্ছে না। এখনো ছোটখাটো অনেক কাজ বাকি। ফলে ঠিক কবে নাগাদ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সব সেবা আগের মতো পুরোপুরি চালু করা যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে যত দ্রুত সম্ভব সেবার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এদিকে কেন্দ্রটির কাঠামোগত সংস্কারের দায়িত্ব নিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। গত রোববার কেন্দ্রটি পরিদর্শনের পর তিনি নিজস্ব অর্থায়নে সংস্কারকাজ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন।
শনিবার সন্ধ্যায় আমিনুল হক জানান, দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে এবং আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শেষ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে লুট হওয়া দুই ট্রাক পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। উদ্ধার হওয়া সামগ্রী বর্তমানে পুলিশ প্রশাসনের জিম্মায় রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় সেগুলো স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্রের তালিকা এবং কী কী প্রয়োজন, তা স্পষ্ট হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে পরিবার পরিকল্পনা সেবার প্রয়োজনীয় কিছু চিকিৎসা উপকরণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়ার কথা রয়েছে। শিশুদের টিকাও সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের জন্য সরকারের কাছ থেকেও সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সব মিলিয়ে, হামলার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা ফিরিয়ে আনতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও আসবাব সংগ্রহ করা। ভবন প্রস্তুত হলেও সেবা পুরোপুরি ফিরতে তাই আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন