কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের পানি আর বাঁধের ফাটল—দুইয়ের চাপে বড় বিপদের মুখে সাতক্ষীরার তালার চার গ্রামের মানুষ। শনিবার রাতে বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার পর গ্রামবাসীর সম্মিলিত চেষ্টায় আপাতত পানি আটকানো গেলেও নতুন করে আরও দুটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে লোনাপানিতে প্লাবিত হতে পারে কয়েক হাজার মানুষের বসতবাড়ি, মাছের ঘের ও কৃষিজমি। মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁধের নতুন ফাটল দিয়ে পানি চুঁইয়ে ভেতরে ঢুকছে। গত চার দিন ধরে পালা করে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দুর্বল জায়গাগুলো মাটি দিয়ে শক্ত করার চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত জনবল ও উপকরণ না থাকায় কতক্ষণ এই প্রতিরোধ টিকবে, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
শনিবার রাতে জোয়ারের পানির তীব্র চাপে বালিয়া গ্রামের বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। বিলের মাছের ঘেরের মালিকেরা প্রথমে বিষয়টি দেখতে পেয়ে দ্রুত গ্রামে খবর দেন। পরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হলে ঘুম থেকে উঠে নারী-পুরুষ-শিশুরা ঝুড়ি ও কোদাল নিয়ে বাঁধের দিকে ছুটে যান। সম্মিলিতভাবে মাটি ফেলে ভাঙা অংশটি সাময়িকভাবে মেরামত করে লোকালয়ে পানি ঢোকা ঠেকানো হয়। কিন্তু বিপদ এখনো কাটেনি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বাঁধটি ভেঙে গেলে বালিয়ার পাশাপাশি শুভংকরকাঠি, তেঘরিয়া ও শ্রীমন্তকাটি গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বিস্তীর্ণ মাছের ঘের ও কৃষিজমি প্লাবিত হয়ে ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই কপোতাক্ষ নদের এই অংশটি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর আগে নদ খননের সময় সিএস মানচিত্র অনুযায়ী কাজ করার দাবি জানিয়েছিলেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে দুই দিন সেই অনুযায়ী কাজ হলেও পরে খননের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। এতে নদটি জনবসতির কাছাকাছি চলে আসে এবং বালিয়া অংশে স্রোত ও গভীরতা বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি জোয়ার-ভাটা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের পর নদটি আরও খরস্রোতা হয়ে ওঠে বলে দাবি স্থানীয়দের। কিন্তু সেখানে স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় প্রতিবছর জোয়ারের পানির চাপে বাঁধের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কৃষক ও মাছের ঘেরের মালিকেরা বারবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
খেশরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামরুল ইসলাম লাল্টু জানিয়েছেন, বাঁধের একাধিক জায়গা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো এলাকা লোনাপানিতে ডুবে যেতে পারে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি তার। তবে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া জানিয়েছেন, বাঁধের পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা অবগত এবং তিনি নিজেও এলাকা পরিদর্শন করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুরোধে প্রাথমিকভাবে কাজের অনুমতি পাওয়া গেলেও পরে তা বাতিল হয়। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সারা দেশে জরুরি কাজ বন্ধ থাকায় সেখানে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন করে বরাদ্দ পাওয়া গেলে বাঁধ মেরামতের কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এখন চার গ্রামের মানুষের একটাই দাবি—বাঁধ ভেঙে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করতে হবে। পাশাপাশি কপোতাক্ষ নদের বালিয়া অংশে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন